২০২৬ সালের গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, ভোটের গাড়ি চালু করে দেশব্যাপী ২,১৬৯টি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সদরসহ দূরবর্তী এলাকায় ‘জনমত বাক্স’ স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল নাগরিকদের সরাসরি মতামত, পরামর্শ ও সমালোচনা সংগ্রহ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পৌঁছে দেওয়া। চালু হওয়া প্রথম সপ্তাহেই ৪০,২০৬ জন ভোটার কাগজে লিখে তাদের চিন্তা প্রকাশ করে।
‘দেশের চাবি, আপনার হাতে’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এই সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, ভোটারদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব জোরদার করার পাশাপাশি সরকারী নীতি‑নির্ধারণে জনমতকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ভোটের গাড়ি প্রতিটি থামার জায়গায় ‘জনমত বাক্স’ রেখে, মানুষকে স্বতন্ত্রভাবে তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা লিখে জমা দিতে আহ্বান জানায়।
বিভাগভিত্তিক মন্তব্যের সংখ্যা প্রকাশে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগ থেকে ১০,২১৬টি, চট্টগ্রাম থেকে ৬,০০৬টি, সিলেট থেকে ১,৬৫১টি, বরিশাল থেকে ২,১২৪টি, খুলনা থেকে ৪,৬৭৮টি, রংপুর থেকে ৩,৬০৫টি, রাজশাহী থেকে ৫,৭৩৮টি এবং ময়মনসিংহ থেকে ১,৭৯৯টি মন্তব্য পাওয়া গেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
মন্তব্যগুলোর বিষয়বস্তু ব্যাপকভাবে বিচিত্র। কিছু নাগরিক ব্যক্তিগত দুঃখ ও কষ্টের কথা শেয়ার করেন, অন্যরা পাবলিক সার্ভিসে হয়রানি মুক্ত পরিবেশের দাবি করেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার, জুলাই ২০২২‑এর হত্যাকাণ্ডে ন্যায়বিচার, লিঙ্গ সমতা, শিশুর নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের আহ্বানও উল্লেখিত হয়। একই সঙ্গে, কিছু মন্তব্যে সরকারকে সরাসরি সমালোচনা করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক টীকা পাওয়া যায়।
দিনাজপুরের কয়েকজন নাগরিক—লিজা, বিপাশা, সুমি, লিনা ও বৃষ্টি—বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, জুলাই গণ‑অভ্যুত্থানের স্মরণে দেশের সংস্কারকে ত্বরান্বিত করা দরকার। তারা নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষার ওপর জোর দেন, ধর্ষণ মামলাগুলোর রায় দশ দিনের মধ্যে কার্যকর করার দাবি করেন এবং যে কোনো রাজনৈতিক দলই আসুক না কেন, দেশের উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে বলে আহ্বান জানান। এই ধরনের মন্তব্যগুলো জনগণের বাস্তবিক চাহিদা ও প্রত্যাশা তুলে ধরে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, সব মন্তব্য একত্রে পড়ার পর, জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিকতাকে অমূল্য সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সকল প্রশংসা, পরামর্শ, সমালোচনা ও নিন্দা কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়া সংরক্ষণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে নীতি‑নির্ধারণে বিবেচনা করা হবে।
ভোটের গাড়ি ক্যাম্পেইন, ইউনিয়ন স্তর থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা সদর পর্যন্ত, পাশাপাশি গ্রাম‑গ্রাম, পাহাড়ি ও নদীর পারের দূরবর্তী এলাকায়ও পৌঁছেছে। এই বিস্তৃত উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে যে, দেশের প্রতিটি কোণ থেকে মতামত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে এবং কোনো গোষ্ঠী বাদ পড়েনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই বৃহৎ পরিসরের জনমত সংগ্রহ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রার্থীরা ও দলগুলো, ভোটারদের প্রকাশিত চাহিদা—যেমন দুর্নীতি মোকাবেলা, শিক্ষা সংস্কার, নারী ও শিশুর সুরক্ষা—কে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ম্যানিফেস্টোতে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রচারণা চলমান থাকায়, ‘জনমত বাক্স’ আরও বেশি স্থানে স্থাপন করা হবে এবং জমা দেওয়া মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করে সরকারী নীতি‑নির্ধারণে ব্যবহার করা হবে। এই প্রক্রিয়া, ভোটারদের সরাসরি শোনার মাধ্যমে, গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



