মণিপুরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত রাজ্যটি এক বছর আগে কেন্দ্রীয় শাসনে রাখা হয়, যখন জাতিগত সংঘাতে ২৬০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এই পরিস্থিতির পর, ১০ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণকারী যুমনাম খেমচাঁদ সিংহ, তায়কোয়ান্ডোতে পাঁচ ড্যান ব্ল্যাক বেল্টধারী, নতুন মুখে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।
সিংহের শাসনভার গ্রহণের সময়, মণিপুর এখনও প্রধানত মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বহন করে। ২০২৩ সালের সহিংসতার পর দুই গোষ্ঠী প্রায় সম্পূর্ণভাবে পৃথক অঞ্চলেই বসবাস করছে, হাজারো পরিবার তাদের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
যুমনাম খেমচাঁদ সিংহের তায়কোয়ান্ডো প্রশিক্ষণ বহু বছর আগে শুরু হয় এবং তিনি বহু বছর ধরে এই মার্শাল আর্ট শেখাতেও যুক্ত ছিলেন। তবে তিনি কেবল ক্রীড়াবিদ নয়, দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদও। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংগঠন (RSS) এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, তিনি ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে জয়লাভ করেন এবং এরপর থেকে বিধানসভার স্পিকার ও শিক্ষা ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
বিএজিপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) এর সদস্য সিংহের শাসনভার গ্রহণের পর, রাজ্যের শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তীব্র। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনা রাজ্যের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শপথের পরপরই মণিপুরের চুরাচন্দপুর জেলায় প্রতিবাদ শুরু হয়। রাস্তায় বাধা সৃষ্টি, বাজার ও সরকারি অফিস বন্ধ হয়ে যায়। কুকি-জো নাগরিক সমাজ ও ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন সরকারের গঠনে কিছু কুকি-জো বিধায়কের অংশগ্রহণকে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত করে এবং আলাদা স্বায়ত্তশাসনের দাবি পুনরায় তীব্র করে।
এই উত্তেজনার মধ্যে, ২১ জানুয়ারি মেইতেই সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি কুকি-জো অধিকাংশ এলাকায় তার স্ত্রী কুকি-জো হওয়ায় গৃহহীন হয়ে গিয়েছিলেন। এই ঘটনা সংঘাতের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের একটি নতুন উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিংহের শাসনকালে, তিনি শিক্ষা, গ্রামোন্নয়ন এবং সম্প্রদায়ের সমন্বয়মূলক নীতি চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তার তায়কোয়ান্ডো পটভূমি এবং শারীরিক প্রশিক্ষণকে কীভাবে রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজ্যটির বর্তমান অবস্থা এবং শাসনকালের চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনা করে, বিশ্লেষকরা আশা করেন যে সিংহের নেতৃত্বে শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে কুকি-জো ও মেইতেই সম্প্রদায়ের মধ্যে অব্যাহত অবিশ্বাস, পুনর্বাসনের সমস্যার সমাধান এবং অতীতের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া যদি যথাযথভাবে না করা হয়, তবে সংঘাতের ঝড় আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়ে যায়।
মণিপুরের নতুন মুখের শাসনকালে, জাতিগত সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করা, পুনর্বাসন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এই দিকগুলো সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন হলে, রাজ্যটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে।
অবশেষে, শাসনভার গ্রহণের পরের প্রথম সপ্তাহে ঘটিত প্রতিবাদ এবং সম্প্রদায়ের অস্থিরতা, নতুন সরকারের নীতি ও পদক্ষেপের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে। সিংহের নেতৃত্বে মণিপুরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তার ক্ষমতা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জাতিগত সংহতির প্রতি তার অঙ্গীকারের ওপর।



