গভর্নর আহসান এইচ. মানসুর আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৮ মাসে আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সংস্কার চালু করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের সংশোধনী অনুমোদন না হওয়ায় স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা থেমে গেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে।
গতকাল অনুষ্ঠিত মুদ্রা নীতি ব্রিফিংয়ে মানসুর স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, এই সংস্কারটি জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে উপস্থাপন করা হবে। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সভায় কর্মকর্তারা সরকারের অস্বীকৃতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ব্রিফিংয়ে মানসুর স্পষ্টভাবে জানান, “এটি হওয়া উচিত ছিল; আমরা আশা নিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছি। কেন অনুমোদিত হয়নি, তা আমি বলতে পারি না, তবে এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয় এবং আমরা পরবর্তী সরকারের কাছে উপস্থাপন করব।” তার এই মন্তব্য স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাবের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা প্রথমবার অক্টোবর ২০২৩-এ আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডের কাঠামো পুনর্গঠন, গভার্নরের নেতৃত্বের ক্ষমতা বৃদ্ধি, শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বরখাস্ত প্রক্রিয়ার সংশোধন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ধাপের লক্ষ্য ছিল মুদ্রা নীতি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা।
অন্যদিকে, অর্থ উপদেষ্টা সালেহুদ্দিন আহমেদ, যিনি পূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভার্নর ছিলেন, রবিবার মানসুরকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন যে, অস্থায়ী সরকারের মেয়াদে এমন মৌলিক আইন সংশোধন করা বাস্তবিকভাবে কঠিন। তিনি উল্লেখ করেন যে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই এই অর্ডারটি পুনর্বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত হবে।
আহমেদের চিঠিতে জোর দেওয়া হয়েছে যে, কোনো সংশোধনের জন্য “বিস্তারিত পর্যালোচনা” এবং বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে পরামর্শ প্রয়োজন। তিনি পরামর্শ দেন যে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারই এই প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নেবে, যাতে সংস্কারটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়।
এই ধীরগতি সরকার-ব্যাংক সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়। যদিও সাম্প্রতিক মাসে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবু স্বায়ত্তশাসনের অভাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বতন্ত্রতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আইনগত সুরক্ষা ছাড়া মুদ্রা নীতি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। স্বায়ত্তশাসন না থাকলে বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সংস্কার পরিকল্পনার স্থগিত হওয়া দীর্ঘমেয়াদী শাসন মানদণ্ডে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে, স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়নি এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে উপস্থাপন করার প্রস্তুতি চলছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করে মুদ্রা নীতি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা লক্ষ্য।
সারসংক্ষেপে, স্বায়ত্তশাসন সংস্কারকে রাজনৈতিক চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। পরবর্তী সরকার যদি এই সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বতন্ত্রতা ও আর্থিক বাজারের স্বাস্থ্যের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।



