বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর বস্তুছোঁড়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে আবার নজরে এসেছে। ঢাকায়, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ বহু শহরে জনসমাবেশে কেক, ডিম, টমেটো ও জুতা ছুঁড়ে প্রতিবাদ করা হয়েছে। এই ধরনের কর্মের মূল উদ্দেশ্য শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং নেতার মর্যাদা হ্রাস এবং জনমতকে দৃশ্যমান করা।
ইতিহাসে প্রথম বস্তুছোঁড়ার রেকর্ড রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ানের বিরুদ্ধে পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় ৬৩ সালে আফ্রিকায় খাদ্য সংকটের সময় ক্ষুব্ধ জনগণ সম্রাটের দিকে শালগম ছুঁড়ে দেয়। ঐ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, শাসকের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের একটি প্রাচীন পদ্ধতি ইতিমধ্যে দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো।
বঙ্গের ঐতিহ্যিক উদাহরণে ১৯শ শতাব্দীর নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ উল্লেখযোগ্য। ঐ নাটক প্রদর্শনের সময় বিদ্যাসাগর মঞ্চের দিকে জুতা ছুঁড়ে মেরেছিলেন বলে বলা হয়। কিছু সূত্রে বলা হয়, তিনি ব্রিটিশ শাসনের নৃশংসতা দেখে তা করেছেন; অন্যদিকে, নাটকের অভিনেতা অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি এই কাজকে সম্মানের চিহ্ন হিসেবে গ্রহণ করতেন। যদিও এই ঘটনার সঠিক বিবরণ ভিন্ন, তবু তা রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি চিত্র তুলে ধরে।
ইংরেজ লেখক ব্র্যাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ প্রকাশের পর তার স্বজনের সঙ্গে একটি মজার কথোপকথন রেকর্ড হয়। তিনি এক বন্ধুকে বলেন, “আমি জনপ্রিয় হয়ে উঠছি,” যার উত্তর ছিল, “গত রাতে লোকজন তোমার দিকে পচা ডিম ছুঁড়ছে।” বন্ধুটি হাসি দিয়ে জবাব দেন, “আগে তারা ইট ছুঁড়ত।” যদিও এই গল্পটি রসিকতা হিসেবে রচিত, তবু এটি দেখায় যে জনসাধারণের অসন্তোষের প্রকাশের পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও মূল লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকে।
আধুনিক সময়ে স্পেনের লা তমাতিনা উৎসবের নিয়ম অনুসারে টমেটো ছুঁড়ার আগে সেগুলোকে নরম করে নেয়া হয়, যাতে আঘাতের মাত্রা কমে। যদিও এই উৎসব মূলত মজা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে উদযাপন করে, তবে টমেটো ছুঁড়ার প্রথা রাজনৈতিক সমাবেশে অনুকরণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু শহরে টমেটো, ডিম ও কেকের মাধ্যমে নেতাদের সমালোচনা করা হয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী রীতির আধুনিক রূপ হিসেবে দেখা যায়।
প্রতিবাদকারীরা সাধারণত বস্তুছোঁড়াকে শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক অপমানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা দাবি করে, এই পদ্ধতি দ্রুত দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের বার্তা বিস্তৃত করে। অন্যদিকে, নিরাপত্তা দায়িত্বশীল সংস্থাগুলি বস্তুছোঁড়াকে অপরাধমূলক কাজ হিসেবে গণ্য করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে রাজনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। সরকারগুলো এখন সমাবেশের পূর্বে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাড়িয়ে তুলছে, যেমন ধাতব ডিটেক্টর, সিকিউরিটি গার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনসমাগমের স্থানগুলোতে বস্তুছোঁড়া প্রতিরোধী গেট স্থাপন। একই সঙ্গে, সামাজিক মাধ্যমে বস্তুছোঁড়ার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ফলে জনমত গঠনে নতুন গতিবেগ দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, বস্তুছোঁড়ার প্রথা যদি নিয়মিতভাবে পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি স্বাভাবিক অংশে পরিণত হতে পারে। তবে, আইনি শাস্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতা বজায় রাখলে এই প্রথা সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব। ভবিষ্যতে, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের সুযোগ বাড়িয়ে এবং জনসাধারণের অভিযোগের যথাযথ সমাধান প্রদান করে এই ধরনের হিংসাত্মক প্রকাশের প্রয়োজন কমানো যেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বস্তুছোঁড়া একটি প্রাচীন প্রতিবাদ পদ্ধতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে। রোমান সম্রাটের শালগম থেকে আধুনিক শহরের টমেটো ও ডিম পর্যন্ত, এই প্রথা রাজনৈতিক উত্তেজনার দৃশ্যমান প্রকাশ হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তা ও আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং জনমতের বৈধ চ্যানেল তৈরি করা এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হবে।



