ইলেকশন পূর্বদিনে ফেসবুকের ফিডে ভুয়া উক্তি, পরিবর্তিত ছবি ও ভুল ফটোকার্ডের ঝড়ে ভোটারদের তথ্যভ্রান্তি বাড়ছে। সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটি এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তথ্যযুদ্ধের প্রধান মঞ্চে রূপান্তরিত হয়েছে। নকল উক্তি ও কৃত্রিম ভিজ্যুয়াল ব্যবহার করে ভোটারদের মতামত গঠন করার প্রচেষ্টা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
ফেসবুকে প্রচারিত ভুয়া তথ্যের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে তৈরি করা কৃত্রিম উক্তি, পরিবর্তিত ছবি এবং বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড অন্তর্ভুক্ত। এসব কন্টেন্টের লক্ষ্য হল জনগণের মধ্যে রাগ ও উত্তেজনা সৃষ্টিকরা, বিশেষ করে এমন উক্তি যা কোনো নেতা কখনো বলেননি। তদুপরি, বিদেশি সমর্থন বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নির্দেশ করতে অপ্রাসঙ্গিক ছবি ব্যবহার করে মিথ্যা ধারণা গড়ে তোলা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা তৈরি ভিজ্যুয়ালও এই প্রচারণার অংশ। AI‑সৃষ্ট ছবি ও ভিডিওতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কল্পিত বৈঠক, গোপন চুক্তি এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব কন্টেন্ট বাস্তব ঘটনার মতো দেখিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়িয়ে তুলছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজমের প্রধান ডিন এম সুমন রহমান, যিনি ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ULAB)‑এর হেড এবং FactWatch‑এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, এ বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভুয়া তথ্যের মূল উদ্দেশ্য ভোটারদের পছন্দকে প্রভাবিত করা এবং নিশ্চিত ভোটারদের ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা মতামতকে শক্তিশালী করা। স্বল্পমেয়াদে ধর্ম, সহিংসতা এবং অন্যান্য উত্তেজনাপূর্ণ উপাদান ব্যবহার করে অনির্ধারিত ভোটারদের (সুইং ভোটার) দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মধ্য-ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে মধ্য-জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত এক মাসের সময়কালে, The Daily Star ২২০টি ভুয়া তথ্যের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এই ঘটনাগুলো বিভিন্ন দলীয় সমর্থক গোষ্ঠীর দ্বারা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জামাত সমর্থক গোষ্ঠী ৯৬টি কেসে শীর্ষে রয়েছে, যা মোট ঘটনার অর্ধেকের বেশি। আওয়ামী লীগ সমর্থক গোষ্ঠী ৭৮টি এবং বিএনপি সমর্থক গোষ্ঠী ৩৮টি কেসে যুক্ত হয়েছে।
এই ২২০টি পোস্টের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মোট ২ মিলিয়নের বেশি লাইক, মন্তব্য ও শেয়ার হয়েছে, যা দেখায় কত দ্রুত ভুয়া কন্টেন্ট ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারে। উচ্চ মাত্রার এনগেজমেন্টের ফলে তথ্যের গতি বাড়ে এবং ভোটারদের মধ্যে ভুল ধারণা দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন যে, এই ধরনের তথ্যযুদ্ধ নির্বাচনের ফলাফলকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে এবং দলীয় বিরোধকে তীব্রতর করতে পারে। ভোটারদের সচেতনতা বাড়াতে এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নির্বাচনের আগে সামাজিক মিডিয়ার পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে ভোটাররা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ভবিষ্যতে, তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং নাগরিক শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন হবে। ভোটারদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাধারা গড়ে তোলা এবং ভুয়া কন্টেন্টের প্রতি সতর্কতা বৃদ্ধি করা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষার মূল চাবিকাঠি হবে।



