খাদ্য অপরাধের ঘটনা অধিকাংশই রিপোর্ট না হওয়ায় এর প্রকৃত পরিসর নির্ধারণ কঠিন। বিশেষ করে মধু, দুধ, অলিভ অয়েল ও সি-ফুডের মতো উচ্চ চাহিদার পণ্যে জালিয়াতি ব্যাপকভাবে ঘটছে। এই ধরনের অপরাধের ফলে ভোক্তাদের নিরাপত্তা ও উৎপাদনকারীদের আয় দু’ইই হুমকির মুখে পড়ে।
খাদ্য জালিয়াতি বলতে মূল উপাদানকে পাতলা করা, অন্য কোনো পণ্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করা, নথিপত্র পরিবর্তন করা অথবা অনুমোদনহীন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজ প্রায়শই গোপনীয়ভাবে এবং তদারকি ছাড়া সম্পন্ন হয়, ফলে বাজারে নকল পণ্য সহজে প্রবেশ করে।
২০২৫ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপরাধের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৮১ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার) হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। এই অঙ্কটি দেখায় যে অপরাধের পরিধি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা গুরুতর।
অপরাধীরা সাধারণত সর্বাধিক ব্যবহৃত খাবার যেমন দুগ্ধজাত পণ্য এবং উচ্চমূল্যের পণ্য যেমন অলিভ অয়েলকে লক্ষ্য করে। মধু, অ্যালকোহল, সি-ফুড এবং বিভিন্ন ভেজিটেবল তেলও প্রায়শই নকলের শিকার হয়। এসব পণ্যের জনপ্রিয়তা ও মূল্য জালিয়াতির আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়।
মধুর নকলের ক্ষেত্রে, গাঁজনের জন্য চিনি গাছ থেকে প্রাপ্ত গ্লুকোজ সিরাপের দাম প্রকৃত মধুর অর্ধেক বা তার চেয়েও কম হতে পারে। তাই উৎপাদনকারীরা কম খরচে বড় মুনাফা অর্জনের জন্য সিরাপ মিশিয়ে বিক্রি করে।
স্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্সেসের মলিকুলার বায়োলজি ইনস্টিটিউটে মৌমাছি ও তার পণ্যের গবেষণার দায়িত্বে থাকা ড. জুরাজ মায়টান পাঁচটি মৌচাক পরিচালনা করেন। তিনি মধুর জৈবিক জটিলতা ও তার শত শত রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন।
মধুতে উপস্থিত বিভিন্ন প্রোটিন, এনজাইম, ভিটামিন ও মিনারেল একে অনন্য করে তোলে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য দেখা যায়। এই বৈচিত্র্যই মধুকে নকল করা কঠিন করে তোলে।
তবে, সিরাপ, চাল, গম, ভুট্টা বা চুকন্দের মতো শস্য থেকে তৈরি স্যুগার সলিউশন মিশিয়ে মধুকে নকল করা সম্ভব। এমন মিশ্রণকে সনাক্ত করা কঠিন, কারণ শর্করার মাত্রা প্রায় মূল মধুর সমান হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মধুর জন্য কোনো একক সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, ফলে বিভিন্ন দেশে মানদণ্ড ভিন্ন এবং নকল পণ্যের সীমানা নির্ধারণে অসুবিধা হয়।
নকল মধু কখনও পাতলা ও স্বাদে দুর্বল হতে পারে, তবে আধুনিক কৌশলে তৈরি জালিয়াতি মূল মধুর চেহারা, গন্ধ ও স্বাদ সম্পূর্ণ নকল করতে পারে। এমনকি উন্নত রাসায়নিক বিশ্লেষণেও শর্করার সমতা কারণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
মধুর গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য রাসায়নিক বন্ধন বিশ্লেষণ, আইসোটোপের অনুপাত নির্ণয় এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এসব পদ্ধতি মূল মধু ও নকলের পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করে, তবে একক পদ্ধতি দিয়ে নিশ্চিত ফলাফল পাওয়া যায় না।
বর্তমানে কোনো একক পরীক্ষণ পদ্ধতি নেই যা সম্পূর্ণভাবে নকল মধু চিহ্নিত করতে পারে; তাই গবেষকরা নতুন প্রযুক্তি ও সমন্বিত পদ্ধতির বিকাশের আহ্বান জানাচ্ছেন।
মধু জালিয়াতির প্রধান ক্ষতি মৌমাছি পালকের আয়ে প্রভাব ফেলে, কারণ প্রকৃত মধু বিক্রি না হলে মধুকারীরা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তদুপরি, নকল মধুতে অ্যালার্জেন বা টক্সিক পদার্থের উপস্থিতি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারী তদারকি শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গঠন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সনাক্তকরণ পদ্ধতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। এভাবে খাদ্য অপরাধের বিস্তার রোধ করে সৎ উৎপাদনকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে।



