সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় ৯ ফেব্রুয়ারি রাতভর বাসের ঘাটতি ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বহু যাত্রী রওনা হতে পারছেন না। ভোটের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সরকার তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করে, ফলে গ্রাম‑শহরের মধ্যে যাতায়াতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। এই অপ্রত্যাশিত প্রবাহে সড়ক‑পথে গাড়ি না পাওয়া, ভাড়া বাড়ার সমস্যায় মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়।
সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি বাইপাইল এলাকায় ১৬ মাসের শিশুসহ সুলতানা নাসরিন গাড়ি না পেয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন। তিনি শিশুকে কাছের দোকান থেকে খাবার কিনে খাওয়াতে লাগলেন, তবে গাড়ি না আসায় অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তার মতোই বহু পরিবারই গ্রাম‑বাড়ি ফেরার জন্য রওনা হতে চাচ্ছিল, কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় আটকে পড়েছে।
সরকারের ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি ও ১১‑১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ছুটির ঘোষণার পর, সাভার, আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর চাপ বাড়ে। কর্মচারী ও শ্রমিকরা ছুটির দিন কাজে না গিয়ে বাসের অপেক্ষা শুরু করে, ফলে প্রধান মহাসড়কগুলো—ঢাকা‑আরিচা, কালামপুর‑ঢুলিভিটা, নবীনগর‑সাভার, আমিনবাজার ও নবীনগর‑চন্দ্রা—এ ঘরমুখো যাত্রীদের স্রোত দেখা যায়।
বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে গাইবান্ধা যাওয়ার পথে নাসিমা বেগম স্বামীর সঙ্গে কন্যা‑সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জানান, “ছুটি হয়েছে, তবে বেতন এখনও ব্যাংকে জমা হয়নি, বিকাশ থেকে টাকা তোলাও যাচ্ছে না। গাড়ি ভাড়া ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত চাহা হচ্ছে, আর আমরা কীভাবে এই খরচ বহন করব?” তার উদ্বেগে শিশুরা রাতে অস্থির অবস্থায় রয়েছে।
নাসিমা বেগমের পাশাপাশি, অন্য এক যাত্রী হেলেনা রোডে গাড়ি না পাওয়ায় “বাড়িতে মা‑মুরুব্বি আছে, সবাই আমাদের অপেক্ষা করছে; কিন্তু এত উচ্চ ভাড়া দিয়ে কীভাবে বাড়ি পৌঁছাবো?” বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সময়ে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পথে বাসের অপেক্ষায় থাকা হাসান আলী টিভি চালু করে খবর দেখছেন এবং বলেন, “ছুটির দিনগুলোতে বাসের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, মানুষ রাস্তায় আটকে আছে।”
এই পরিস্থিতি শুধু যাত্রীদের নয়, স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বাসস্ট্যান্ডের আশেপাশের দোকানগুলোতে খাবার ও পানীয়ের চাহিদা বাড়লেও, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না পারা গ্রাহকদের সংখ্যা কমে যায়। ফলে বিক্রয় হ্রাস পায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত বাস চালু করার পরিকল্পনা ছিল, তবে গাড়ি চালকের অনুপস্থিতি ও জ্বালানি সরবরাহের সমস্যার কারণে তা কার্যকর হয়নি। সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ছুটির সময়ে নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবহন নিশ্চিত করা হবে, তবে বাস্তবে তা পূরণ হয়নি।
বহু যাত্রী উল্লেখ করেছেন, “দীর্ঘ সময়ের পর ভোটের জন্য গ্রামে ফিরে যাওয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই অবস্থা আমাদের পরিকল্পনা নষ্ট করে দিচ্ছে।” তারা আশা করছেন যে, সরকারি দপ্তর দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত বাস চালু করবে এবং ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
অধিকাংশ যাত্রীই জানিয়েছেন, তারা রওনা হতে পারলে তৎক্ষণাৎ বাড়ি পৌঁছাতে চান, কারণ গ্রামাঞ্চলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোই এই ছুটির মূল উদ্দেশ্য। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে, অনেকেই রাতের খাবার ও শোবার জায়গা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
এই ঘটনার পর, বাংলাদেশ সরকার নির্বাচনের পরপরই পরিবহন ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যদিও সরাসরি মন্তব্য না করা হলেও, নির্বাচনের ফলাফল ও জনমত গঠনেও এই ধরনের অবহেলা প্রভাব ফেলতে পারে।
সাভার‑আশুলিয়া অঞ্চলে রাস্তায় জমা যাত্রীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, স্থানীয় পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জরুরি ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো জরুরি বাস বা শাটল সেবা চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
সর্বোপরি, ছুটির দিনে বাসের ঘাটতি ও উচ্চ ভাড়া গ্রাম‑শহর সংযোগে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। যাত্রীরা নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাতে পারলে, নির্বাচনের পরবর্তী দিনগুলোতে এই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।



