আসামের নগাঁও জেলার হোজাই উপজেলায় ৫০ বছর বয়সী ফাজিলা খাতুনের পরিবার সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের পর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ভয়ে ঘুমাতে পারছে না। ১.৫ মাস আগে লুটুমারি সংরক্ষিত বনভূমি থেকে ৩৩১টি পরিবারকে স্থানান্তর করা হয় এবং সরকার ৬,০০০ বিঘা জমি পুনরুদ্ধার করে। উচ্ছেদের পর পরিবারগুলোকে নতুন ঠিকানা দিয়ে ভোটার তালিকায় পুনর্নিবন্ধনের জন্য বিশেষ সংশোধন (SR) প্রক্রিয়ার আওতায় শোনানির নোটিশ পাঠানো হয়।
ফাজিলা খাতুনের মতে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি হারিয়ে যাবে এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি প্লাস্টিকের চাদরে ঢাকা ছোট ঘরে বসবাস করছেন এবং তার মতো আরও শতাধিক পরিবার একই সমস্যার সম্মুখীন। নোটিশ পাওয়ার পর তিনি এবং তার সন্তানরা নির্বাচনী অফিসে গিয়ে সব প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছেন, তবে শোনানিতে না গিয়ে নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানটি ২৯ নভেম্বর থেকে দুই দিন ধরে চালানো হয় এবং সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে জঙ্গলের জমি অবৈধ দখলদারদের থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপের ফলে বহু পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে নতুন ঠিকানা পেতে বাধ্য হয়েছে, যা ভোটার তালিকায় রেকর্ড আপডেটের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচনী কমিশনের নোটিশে বলা হয়েছে যে উচ্ছেদিতদের নতুন ঠিকানা ও ভোটার আইডি আপডেটের জন্য শোনানিতে অংশ নিতে হবে।
আসামের ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধনের প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশের মতো অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় ভিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যান্য রাজ্যে SR প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়, তবে আসামে শোনানির সংখ্যা বেশি এবং প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। এই পার্থক্যটি নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে মুসলিম ভোটার গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফাজিলার প্রতিবেশী, ৫১ বছর বয়সী মিনারা বেগমও একই নোটিশ পেয়েছেন এবং তাকে হোজাই জেলার নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে শোনানিতে অংশ নিতে বলা হয়েছে। উভয় নারীই উল্লেখ করেছেন যে তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। শোনানিতে না যাওয়া হলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি থাকে, যা তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমাবদ্ধ করবে।
বিবিসি প্রতিবেদনের অনুসারে, উচ্ছেদিত পরিবারগুলোকে শোনানিতে ডাকার মূল কারণ হল তাদের ঠিকানা পরিবর্তন এবং কখনো কখনো বিধানসভা কেন্দ্রের পরিবর্তন। এই প্রক্রিয়া না হলে নির্বাচনী তালিকায় তাদের নাম আপডেট হবে না, ফলে ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না। সরকার এই বিষয়টি সমাধানের জন্য বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া চালু করেছে, তবে বাস্তবায়নে বিলম্ব ও জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে উচ্ছেদ ও ভোটার তালিকা সংশোধনের এই ধারাবাহিকতা আসন্ন লোকসভার নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম ভোটার গোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পেলে দলীয় কৌশল ও জোটের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। এছাড়া, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া হলে সামাজিক অসন্তোষ বাড়তে পারে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে উচ্ছেদ অভিযান পরিবেশ সংরক্ষণ ও অবৈধ দখলদারদের মোকাবিলার জন্য জরুরি, এবং ভোটার তালিকায় সংশোধন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে উচ্ছেদিত পরিবারগুলো এখনও তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য শোনানিতে অংশ নিতে বাধ্য, যা তাদের জন্য মানসিক ও আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি নির্বাচনী কমিশনের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ তারা সঠিক ও সম্পূর্ণ ভোটার তালিকা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি বিরোধ না হয়। একই সঙ্গে, উচ্ছেদিত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়সঙ্গত সমাধান ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি, যাতে তারা নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার বজায় রাখতে পারে।



