মুডি’স, বিশ্ববিখ্যাত ক্রেডিট রেটিং সংস্থা, গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ বিশ্লেষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য ঋণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এটি দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিতকারী দুর্বল অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান আর্থিক পরিবেশে ব্যাংকগুলোকে নিম্নমানের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মুখে কঠিন অপারেশনাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। মুডি’সের মতে, এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতের লাভজনকতা ও সম্পদ গুণগত মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের ৪ শতাংশ থেকে সামান্য উন্নতি। যদিও বৃদ্ধি ধীর, তবু মুডি’স এটিকে সম্ভাব্য লক্ষ্য থেকে নিচে বলে উল্লেখ করেছে।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, দেশটি বহু ম্যাক্রোইকোনমিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, শাসনব্যবস্থার ঘাটতি এবং বেকারত্বের উচ্চ হার অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয় একসাথে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মুডি’সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নতুন সরকারের সুশৃঙ্খল হস্তান্তরের ওপর নির্ভরশীল, যা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নির্ধারিত নির্বাচনের পর ঘটবে। নির্বাচনের পর গৃহীত নীতি অগ্রাধিকারগুলোই ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির দিক নির্ধারণ করবে।
প্রস্তুতকারক পোশাক শিল্প, যা রেডি-মেড গার্মেন্ট সেক্টর নামে পরিচিত, এখন পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নে স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে মুডি’সের মতে, চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অশান্তি ব্যবসায়িক মনোভাবকে দমন করতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি ৮.৩ শতাংশে স্থায়ী থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি হার কমাতে বাধা সৃষ্টি করবে। অক্টোবর ২০২৪ থেকে নীতি হার ১০ শতাংশে স্থির রাখা হয়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতি দমন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
বছরের জানুয়ারি মাসে ১২ মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতি ৮.৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ শতাংশের লক্ষ্য থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই পার্থক্য নীতি নির্ধারকদের জন্য কঠিন সিদ্ধান্তের দরজা খুলে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি হকশি (hawkish) অবস্থায় রেখেছে এবং আগামী জুন পর্যন্ত নীতি হার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃঢ় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
মুডি’স ব্যাংকগুলোর সম্পদ গুণগত মান এবং লাভজনকতা হ্রাসের সতর্কতা দিয়েছে, কারণ ব্যবসায়িক চাহিদা ধীর এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্নের ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনরুদ্ধার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
প্রতিবেদনটি ঋণ মানের তীব্র অবনতি উল্লেখ করেছে, যেখানে অনেক ঋণগ্রহীতা আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। ঋণ ডিফল্টের ঝুঁকি বাড়ার ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে চাপ বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।
সারসংক্ষেপে, মুডি’সের সর্বশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দেয়। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একসাথে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। নীতি নির্ধারকদের জন্য সুসংহত অর্থনৈতিক নীতি এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গঠনই ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হবে।



