হায়দার আলী, ৩১ বছর বয়সী বামহাতি স্পিনার, পাকিস্তানের পাঞ্জাবের আজমত শাহ গ্রাম থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার প্রথম ম্যাচে তিনটি উইকেট নিয়ে শুরুরই সফলতা দেখিয়েছেন। শারজায় বাংলাদেশকে বিপক্ষ করে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টি-২০ ম্যাচে তিনি মাত্র সাত রান করলেও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন, যা নতুন দলের জন্য প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ এনে দেয়।
হায়দার আজমত শাহের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে তার শৈশবের বেশিরভাগ সময় চাচার বাড়িতে কাটে। বাবা-মার বিচ্ছেদের পর ছোটবেলায়ই তাকে আত্মনির্ভরতা শিখতে হয়, আর ক্রিকেটের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা ততই বাড়ে।
কিশোর বয়সে তিনি লাহোরে চলে যান, যেখানে বড় শহরের জীবনের কঠিনতা তাকে রেস্তোরাঁয় ওয়েটার এবং অন্যান্য ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে বাধ্য করে। রাতের বেলা খাবার জোগাতে দ্বিগুণ কাজ করতে হয়, তবু তিনি ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান।
২০১৮ সালে হায়দার পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো অভিষেক হন। যদিও তিনি দেশীয় পর্যায়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখান, তবে তার স্বপ্নের সিঁড়ি সেখানে থেমে যায়। পরবর্তীতে তিনি ইএসপিএন ক্রিকইনফোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশি কিছু প্রকাশ না করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, এবং জীবনের নানা ওঠাপড়া সত্ত্বেও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার কথা বলেন।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় তার আর্থিক অবস্থা আরও কঠিন হয়ে ওঠে, ফলে হায়দারকে রাস্তায় ফল বিক্রি করতে হয়। এই সময়ের সংগ্রাম তাকে নতুন দিকের সন্ধান করতে উদ্বুদ্ধ করে।
২০২২ সালে হায়দার সংযুক্ত আরব আমিরাতে অভিবাসন করেন, যেখানে তিনি নতুন জীবনের সূচনা করেন। দেশান্তরের পর প্রথমে তিনি স্থানীয় ক্লাবগুলোতে খেলতে থাকেন, আর একই সঙ্গে দেশীয় বাসস্থানের নিয়ম মেনে চলতে হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন বছরের বাসস্থানের শর্ত পূরণ করার পর ২০২৫ সালে তিনি আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী দেশের প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা অর্জন করেন। একই বছরে তিনি শারজায় অনুষ্ঠিত সিরিজে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম পদক্ষেপ নেন।
শারজায় বাংলাদেশকে মুখোমুখি হয়ে তৃতীয় টি-২০ ম্যাচে হায়দার ৭ রান এবং ৩ উইকেটের মাধ্যমে দলের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই পারফরম্যান্সের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বকাপ দলে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।
ইলিট লিগ টি-২০ (আইএল টি-২০) ট্রফি জয়ের পথে হায়দার দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে অংশ নেন এবং টুর্নামেন্টে তার দলকে শিরোপা জিততে সহায়তা করেন। এই সাফল্য তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে, যা তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও স্বীকৃতি এনে দেয়।
এ পর্যন্ত হায়দার সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে ২৩টি টি-২০ ম্যাচ খেলেছেন, যেখানে তিনি ৩৩টি উইকেট সংগ্রহ করে গড়ে ১৫.৭২ গড় এবং ৫.৮৩ রান প্রতি ওভারের অর্থনীতি বজায় রেখেছেন। তার স্পিনের ধারাবাহিকতা এবং নিয়ন্ত্রিত গতি তাকে দলের আক্রমণাত্মক পরিকল্পনার মূল স্তম্ভ করে তুলেছে।
অক্টোবর মাসে হায়দার তার ওয়ানডে আন্তর্জাতিক (ওডিআই) ডেবিউ সম্পন্ন করেন, যা তার বহুমুখী দক্ষতাকে আরও প্রমাণ করে। ওডিআইতে তার পারফরম্যান্স এখনও বিশ্লেষণের অধীন, তবে টি-২০তে দেখানো ধারাবাহিকতা তাকে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত করে।
বর্তমানে হায়দার সংযুক্ত আরব আমিরাতের টি-২০ এবং ওডিআই শিডিউলে নিয়মিত অন্তর্ভুক্ত, এবং তার পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তিনি আবারও স্পিনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা করছেন। তার যাত্রা ছোট গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছানোর একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ, যা তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।



