ইরানের রাজধানী তেহরানে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অন্তত পাঁচজন উচ্চপ্রোফাইল সংস্কারবাদের নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন, যার মধ্যে সংস্কারবাদের প্রধান জোটের নেতা আজার মানসৌরি অন্তর্ভুক্ত। এই পদক্ষেপটি জানুয়ারিতে শুরু হওয়া ব্যাপক বিরোধী প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি জানিয়েছে যে নিরাপত্তা বাহিনীর হিংস্র দমনকালে ৬,০০০েরও বেশি প্রতিবাদকারী নিহত হয়েছে, এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সরকারী সূত্রের মতে, গ্রেপ্তারগুলোকে জাতীয় ঐক্যের ক্ষতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করার অভিযোগে করা হয়েছে।
আজার মানসৌরি, যিনি সংস্কারবাদের প্রধান জোটের মুখপাত্র, গ্রেপ্তারের আগে সরকারী দমনকে উন্মোচন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি সম্প্রতি একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, শহীদদের রক্তকে অমরত্বে হারিয়ে যেতে দেবেন না এবং সত্যকে মাটিতে গলে যেতে দেবেন না। তার এই বক্তব্যের পরই নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা তাকে আটক করা হয়। মানসৌরির গ্রেপ্তারকে সংস্কারবাদের স্বরকে দমন করার একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
মানসৌরির পাশাপাশি আরও কয়েকজন সংস্কারবাদের নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। হোসেইন কাররুবি, যিনি ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন এবং তার পিতা মেহদি কাররুবি দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ছিলেন, তাকে আটক করা হয়েছে। সংস্কারবাদের জোটের মুখপাত্র জাভাদ এমাম এবং দুইজন সদস্য ইব্রাহিম আসগারজাদেহ ও মোহসেন আমিনজাদেহকেও আটক করা হয়েছে। এই ব্যক্তিগণ সবই সংস্কারবাদের মূল স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এবং তাদের গ্রেপ্তারকে ইরান সরকারের কঠোর দমন নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেহরানের প্রসিকিউটর অফিসের মতে, গ্রেপ্তারের কারণ হল জাতীয় ঐক্যের ক্ষতি করা এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা। এই অভিযোগগুলোকে ইরান সরকারের দমনমূলক কৌশলের বৈধতা প্রদান করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। একই সময়ে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জয়ী মাসুদ পেজেশকিয়ানের অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পেজেশকিয়ান, যিনি সংস্কারবাদের সমর্থনে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি প্রতিবাদকারীদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করলেও, তার ক্ষমতা ও প্রেসিডেন্সির সীমিত প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার সরকারী তদন্তের আহ্বানও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংকটময় করে তুলেছে।
এই গ্রেপ্তারগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে, যেখানে মধ্যমার্গের কণ্ঠস্বর ক্রমশ নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রচেষ্টা চলছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর কেড়েছে। তবে সংস্কারবাদের নেতাদের গ্রেপ্তার এবং মানবাধিকার সংস্থার মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার তথ্য এই আলোচনার সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে। ইরান সরকার (ইরান সরকার) এখনো এই দমনমূলক পদক্ষেপের বৈধতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মোকাবেলায় কঠিন অবস্থায় রয়েছে।
সংস্কারবাদের প্রধান ব্যক্তিত্বদের গ্রেপ্তার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হিংস্র দমনকে একসাথে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশে স্বতন্ত্র মতামত প্রকাশের স্থান ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই দমন নীতি কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে পারমাণবিক আলোচনায় প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



