২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি গাজা শহরে এক ছয় বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মেয়ে, হিন্দ রজাব, তার পরিবারের মৃতদেহে ঘেরা গাড়িতে আটকে থাকা অবস্থায় ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি-কে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। কলটি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছিল, যেখানে মেয়ে তার কণ্ঠে তীব্র কষ্ট ও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছিল। গাড়ির চারপাশে ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের গুলিবর্ষণ থেকে নিহত আত্মীয়-স্বজনের দেহ দেখা গিয়েছিল।
হিন্দের কলের পর গাজা রেড ক্রিসেন্টের একটি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত পাঠানো হয়, তবে তা গাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছানোর আগে একই ট্যাঙ্কের গুলিতে ধ্বংস হয়ে যায়। এতে দুজন মেডিকের প্রাণও শেষ হয়ে যায়। ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) এই ঘটনায় তাদের সৈন্যের উপস্থিতি অস্বীকার করলেও, লন্ডনের স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ফরেনসিক আর্কিটেকচার স্যাটেলাইট চিত্র ও দৃশ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত করে যে একাধিক ট্যাঙ্ক ওই স্থানে ছিল এবং একটি ট্যাঙ্ক সম্ভবত গাড়িতে ৩৩৫ রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল। একই তদন্তে দেখা যায় যে অ্যাম্বুলেন্সের ওপরও ট্যাঙ্কের গুলি আঘাত হানা সম্ভব।
হিন্দের রেকর্ডেড কণ্ঠস্বরের সত্যতা ও বিশ্লেষণ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট, স্কাই নিউজ এবং ফরেনসিক আর্কিটেকচারসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংস্থা দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই রেকর্ডিং গাজা যুদ্ধের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক প্রমাণগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
তিউনিসিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা কৌথার বেন হানিয়া এই রেকর্ডিং ব্যবহার করে “দ্য ভয়েস অফ হিন্দ রজাব” শিরোনামের একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। তিনি ডকুমেন্টারি ও কাল্পনিক উপাদানকে মিশিয়ে হিন্দের বেঁচে থাকা মুহূর্তগুলোকে পুনর্গঠন করেছেন। এই কাজটি তিউনিসিয়ার প্রতিনিধিত্বে আন্তর্জাতিক ফিচার ক্যাটেগরিতে অস্কার নোমিনেশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নির্মাতার মতে, পুরস্কার নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং এই মনোনয়ন গাজা’র বেঁচে থাকা শিশুদের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, সিনেমা প্রায়ই পালানোর মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তবে এই চলচ্চিত্রটি কণ্ঠের মাধ্যমে বাস্তব ঘটনার স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মানবিক দায়িত্বের কথা জোর দেয়।
হিন্দের কণ্ঠের মাধ্যমে প্রকাশিত এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক মঞ্চে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কয়েকটি দেশ গাজা’র নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রতিনিধি আইডিএফের কর্মকে স্বরক্ষার অধিকার হিসেবে রক্ষা করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র গাজা’র বেসামরিক জনগণের ওপর আক্রমণকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া গাজা’র সামগ্রিক যুদ্ধবিরতির আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে, অস্কার নোমিনেশনটি মিডিয়ার মাধ্যমে গাজা’র মানবিক সংকটকে বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরবর্তী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে গাজা’র বেসামরিক ক্ষতির পরিমাণ ও দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য বিশেষ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।
গাজা অঞ্চলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং হিন্দের কণ্ঠের মতো সরাসরি সাক্ষ্যগুলো আন্তর্জাতিক জনমতকে গঠন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ধরনের প্রমাণের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আইডিএফের কার্যক্রমের ওপর স্বাধীন তদন্তের দাবি বাড়তে পারে, যা কূটনৈতিক চাপকে তীব্র করবে।
অবশেষে, হিন্দ রজাবের ফোন কল ও তার কণ্ঠস্বরের সংরক্ষণ কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং গাজা’র মানবিক সংকটের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই কণ্ঠ বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।



