ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ৮ ফেব্রুয়ারি রবিবারের বার্ষিক এয়ার ফোর্স ডে বৈঠকে উপস্থিত না থেকে ৩৭ বছর পর ঐতিহ্যবাহী রীতি ভেঙে দিলেন। একই দিনে বিমান বাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই সভা তেহরানের সামরিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই অনুপস্থিতি মার্কিন সরকারের বাড়তি সামরিক উপস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সতর্কতার প্রেক্ষাপটে ঘটেছে।
১৯৭৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিমানবাহিনীর প্রথম দফা কর্মকর্তারা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির আনুগত্য স্বীকার করে ঐতিহাসিক এয়ার ফোর্স ডে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর এই দিনটি ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও বিমানবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় সভার মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছে। ১৯৮৯ সালে খামেনি নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে এই মিটিংয়ে অংশ নিতেন, এমনকি কোভিড-১৯ মহামারীর সময়েও উপস্থিতি বজায় রাখেন।
এই বছর, খামেনি উপস্থিত না থাকায় চিফ অব স্টাফ আবদোলরহিম মুসাভি বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। মুসাভি তেহরানের সামরিক প্রস্তুতি ও বিমানবাহিনীর কৌশলগত দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেন, যদিও ধর্মীয় নেতার সরাসরি অংশগ্রহণের ঐতিহ্য ভিন্নমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তনটি তেহরান ও মার্কিন সরকারের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার সময়ে ঘটেছে।
মার্কিন সরকার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের উপকূলের কাছে যুদ্ধজাহাজ ও আধুনিক যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলেছে। জানুয়ারির শেষের দিকে আরব সাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করা হয়, যা অঞ্চলের সামরিক গতিবিধিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করে এবং তেহরানকে চুক্তি না করলে আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে।
তেহরানও একই সময়ে মার্কিন সরকারের সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করেছে। ইরানের সরকার বলেছে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঘটাতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘর্ষের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক সুবিধায় আক্রমণ চালিয়েছিল, যা এই সতর্কতার পটভূমি গঠন করে।
ডিসেম্বরে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি বাড়িয়ে দিয়েছে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা এবং সম্ভাব্য আক্রমণের ইঙ্গিতের ফলে ইরানের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার হয়েছে। এদিকে, মার্কিন সরকার আরব সাগরে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে তেহরানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নীতিগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এই পরিবর্তনগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা নির্দেশ করে। বার্ষিক এয়ার ফোর্স ডে মিটিংয়ে ধর্মীয় নেতার অনুপস্থিতি তেহরানের কূটনৈতিক ভারসাম্য ও সামরিক কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, ভবিষ্যতে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সামরিক শাখার মধ্যে সমন্বয় পদ্ধতি পুনর্গঠন হতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক চাপের মোকাবিলা করা যায়।
সারসংক্ষেপে, ৩৭ বছর পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির এয়ার ফোর্স ডে মিটিং থেকে অনুপস্থিতি এবং চিফ অব স্টাফ আবদোলরহিম মুসাভির নেতৃত্বে বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক তেহরানের নিরাপত্তা নীতির নতুন মোড়কে নির্দেশ করে। এই ঘটনা মার্কিন সরকারের সামরিক উপস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সতর্কতার প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, যা ইরানের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলে প্রভাব ফেলবে।



