ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং সেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে দেশের নির্বাচন পরিবেশে প্রান্তিক গোষ্ঠীর মুখোমুখি ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্থ, পেশি‑শক্তি, ধর্ম, পুরুষতান্ত্রিকতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব ক্রমবর্ধমান এবং এই প্রবণতা ভোটারদের সমান অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান টিআইবির দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন, নারী, আদিবাসী, লিঙ্গ বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী নাগরিকরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে আছেন, কারণ তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এ ধরনের প্রভাবের ফলে এই গোষ্ঠীগুলো তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকারের পর তিনি টিআইবির উদ্বেগগুলো আইনশৃঙ্খলা মনিটরিং সেলকে জানিয়ে দেন। সেলের প্রধান ও কমিশনার সানাউল্লাহ এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন এবং টিআইবির উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন।
একই সময়ে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রের চারশো গজের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ড. ইফতেখারুজ্জামান তা অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করা বরং সমস্যার সমাধান নয়, এবং এই নিষেধাজ্ঞা ভোটারদের মৌলিক অধিকারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রস্তাব করেন, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার রোধের জন্য কঠোর নিয়মাবলী ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যাতে প্রযুক্তি স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে তার অপব্যবহার রোধ করা যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভোটারদের তথ্যের প্রবেশাধিকার বজায় রেখে নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব।
এই মন্তব্যগুলো নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে প্রকাশিত হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। বিশেষত, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, ভোটকেন্দ্রের প্রবেশযোগ্যতা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
কমিশনের সানাউল্লাহের আশ্বাসের পর টিআইবি সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ উপস্থাপন করবে। এই প্রক্রিয়া ভোটার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে।
মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামানের সমালোচনা ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তি ও তৎকালীন যোগাযোগের গুরুত্বকে তুলে ধরে, যা বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না করলে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
টিআইবির এই উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হচ্ছে, যাতে প্রান্তিক গোষ্ঠীর ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে ভোটার শিক্ষা, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং নিরাপদ যোগাযোগ চ্যানেল গড়ে তোলা জরুরি।
আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ে এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। প্রান্তিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না হলে নির্বাচনের বৈধতা ও ফলাফলের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান শেষ পর্যন্ত উল্লেখ করেন, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে অর্থ, পেশি‑শক্তি, ধর্ম ও পুরুষতান্ত্রিকতার অপ্রয়োজনীয় প্রভাব কমিয়ে আনা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি টিআইবির পক্ষ থেকে সকল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই দিকগুলোতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।



