রাশিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বুধবার টিভি ব্রিকসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুটগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় এবং এ জন্য জোরপূর্বক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন, এ ধরনের কৌশল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার নীতি লঙ্ঘন করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মার্কিন আধিপত্যকে দৃঢ় করতে লক্ষ্যভেদ করে।
ল্যাভরভের মন্তব্যের পটভূমি হল গত মাসে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য। ট্রাম্প ব্যবসায়িক পরিবেশকে “বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেশ” গড়ে তোলার কথা বলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে “বিশ্ব অর্থনীতির ইঞ্জিন” বলে বর্ণনা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান-নিম্নতার সঙ্গে অন্যান্য দেশের ভাগ্য যুক্ত করে সতর্ক করেন, “আপনারা আমাদের পতনের সাথে নিচে নামবেন এবং আমাদের উত্থানের সাথে উপরে উঠবেন”।
ল্যাভরভ উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হল জ্বালানি রুটের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের স্বতন্ত্র বিকল্প না থাকে। তিনি বিশেষ করে ইউরোপের “নর্ড স্ট্রিম” গ্যাস পাইপলাইন, ইউক্রেনের গ্যাস পরিবহন ব্যবস্থা এবং “তুর্কস্ট্রিম” প্রকল্পের ওপর মার্কিন নজরদারি বাড়ানোর প্রচেষ্টা উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন সমুদ্রে তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে একটি “যুদ্ধ” চালু করেছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা তেল রপ্তানির ওপর অবরোধ আরোপ করেছে এবং জানুয়ারি মাসের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করেছে। এই দাবিগুলো রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কিন নীতি সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করে।
ল্যাভরভের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি কৌশল হল রাশিয়া ও অন্যান্য অংশীদারদের সস্তা জ্বালানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতসহ বেশ কিছু দেশের ওপর রাশিয়া থেকে সস্তা জ্বালানি কেনা কঠিন করে তুলছে এবং এর পরিবর্তে উচ্চ মূল্যের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার চাপ দিচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি সম্পর্কে ট্রাম্পের পূর্বের হুমকি স্মরণীয়, যেখানে তিনি রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ল্যাভরভ উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ট্রাম্পের একটি মন্তব্যে তিনি ভারতকে রাশিয়া তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি করাতে শুল্ক হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রাশিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তি দেন, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ন্যায্যতা নষ্ট করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জোরপূর্বক হস্তক্ষেপের ফলে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথগুলো সংকুচিত হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর উচ্চ মূল্যের বোঝা বাড়াবে।
ল্যাভরভের মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতির মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তবে রাশিয়া সরকার এখনও এই দাবিগুলোকে কূটনৈতিক স্তরে উপস্থাপন করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কৌশলগুলো বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ, এশিয়ার তেল চাহিদা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় তেল রপ্তানির ওপর এই দ্বন্দ্বের ফলাফল নির্ধারিত হবে।
রাশিয়া সরকার ইতিমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিকল্প গ্যাস রুট বিকাশের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যাতে নর্ড স্ট্রিমের ওপর নির্ভরতা কমে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীন, ভারতসহ অন্যান্য এশীয় দেশের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক নীতি নথি দেখায় যে তারা জ্বালানি রুটের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি করে, যদিও রাশিয়া এই দাবিগুলোকে কূটনৈতিক চাপের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
উল্লেখযোগ্য যে, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পারস্পরিক অভিযোগের মধ্যে কোনো সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের ইঙ্গিত নেই, তবে উভয় পক্ষই জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপায়ে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, আগামী মাসগুলোতে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতি সম্পর্কিত আলোচনায় আরও তীব্রতা দেখা যাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই দ্বন্দ্বের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক বাড়বে।



