রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৩তম সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ১,৮৭,৬০৩ সদস্য দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়। নির্বাচনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত করার দায়িত্বে এই বৃহৎ বাহিনীকে ভোটের দিন পর্যন্ত তৎপর রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই বিশাল উপস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হচ্ছে।
মোট প্রায় দশ লক্ষ সদস্যের মধ্যে প্রায় এক লাখ আটাত্তর হাজার ছয়শো তিনজনই পুলিশ কর্মী, যা পূর্বের নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই সংখ্যা নির্বাচনকালীন সম্ভাব্য অশান্তি, ভোটদানের সময়ের বিশৃঙ্খলা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নির্ধারিত। তদুপরি, নির্বাচনের আগে প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পুলিশ সদস্যের নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ উঠে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে, দুইজন প্রার্থীর সমর্থক দলের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশ নীরব থেকে যাওয়ায় ভোটারদের উদ্বেগ বাড়ে। এই ধরনের অভিযোগ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে।
৬ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীতে সরকারি কর্মচারীদের ৯ম পে-স্কেল দাবির পাশাপাশি শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি নিয়ে প্রতিবাদে পুলিশকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করা হয়। ঘটনাস্থলে গুলিবর্ষণ ও জোরপূর্বক আটকসহ বিভিন্ন ধরণের জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে।
পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, একই পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হতো যদি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিনিধিদল পাঠানো হতো। তারা বলেন, সরাসরি বলপ্রয়োগের বদলে আলোচনার মাধ্যমে দুইটি ঘটনার সমাধান করা যেত। এই মন্তব্যগুলো পুলিশ বাহিনীর কার্যপ্রণালীর পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করা এক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক জানান, ডিএমপির (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) ভূমিকা সঠিক ছিল এবং এটি নির্বাচনের পূর্বে ‘মব’ (মোবিলাইজেশন) নিয়ন্ত্রণের একটি মহড়া হিসেবে কাজ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারী অস্ত্র ব্যবহার না করে বিশৃঙ্খলা দমন করতে পুলিশ আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে ইতিবাচক সূচক প্রদান করে।
পূর্বের ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব নিয়ে সমালোচনা উঠে এসেছে। কিছু সূত্রে বলা হয়, ভোটের পূর্বে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ভোটের সময়সূচি নির্ধারিত হয় এবং কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিক দলের সমর্থক হয়ে ভোট চেয়েছেন। এই অভিযোগগুলো জুলাই ২০২৩-এ ঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময়ও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে ব্যাপক থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট এবং ৪৪জন পুলিশ সদস্যের মৃত্যু ঘটেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর বহু পুলিশ সদস্য শারীরিক ও মানসিক আঘাত পেয়ে এখনও ট্রমা থেকে মুক্তি পাননি। আহত ও শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য কাউন্সেলিং সেশন চালু করা হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া, বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।
সামনের নির্বাচনে পুলিশ বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা এখনও সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তারা উল্লেখ করেন, অতীতের ঘটনাগুলো যদি পুনরাবৃত্তি না হয়, তবে ভোটের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কঠিন হবে। তবে, নির্বাচনের সময় কোনো পক্ষপাতের দৃশ্য দেখা গেলে তা দ্রুত তদন্তের বিষয় হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে, পুলিশকে নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদুপরি, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত কাজের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
অবশেষে, ১৩তম সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও তার বৈধতা নির্ধারণে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে কাজ করে এবং কোনো পক্ষপাতের অভিযোগ না থাকে, তবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে। অন্যথায়, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন তোলা হতে পারে।



