বাংলাদেশের ২০২৪ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন নিকটে আসার সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের প্রবাহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সতর্কতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রান্সের এএফপি সংস্থার সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিছু সূত্রের মতে, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে তিনি ভারতের সীমানা পার করে গৃহীত হতে পারেন। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান সরকারকে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের আশ্রয়ে থাকা হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
এই ধরনের গুজবের মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্যের সনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে কাজ করবে। ইউনিটের কাজের পরিধি সামাজিক মিডিয়া, মেসেজিং অ্যাপ এবং সংবাদ সাইটে প্রকাশিত কন্টেন্টের পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত অপসারণ অন্তর্ভুক্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্ককে ফোন করে এই বিষয়টি নিয়ে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। ড. ইউনূস উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনের সময় অপতথ্যের পরিমাণে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে এবং তা দেশীয় ও বিদেশী উভয় মাধ্যম থেকে আসছে। তিনি আরও বলেন যে, এই মিথ্যা তথ্যের মূল লক্ষ্য ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাস সৃষ্টি করা।
অপপ্রচারের বেশিরভাগই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণমূলক অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সামাজিক নেটওয়ার্কে “হিন্দু জেনোসাইড” হ্যাশট্যাগের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশই ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক হিংসার আওতায় পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত একাধিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অন্তত ১,৭০,০০০টি অ্যাকাউন্ট থেকে ৭ লক্ষেরও বেশি পোস্ট ট্র্যাক করা হয়েছে, যেখানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে মিথ্যা গণহত্যার দাবি করা হয়েছে। সংস্থার প্রধান রকিব নায়েক জানান, এই পোস্টগুলোর অধিকাংশই সরাসরি ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সমর্থনও রয়েছে।
নায়েকের মতে, এই ধরনের সমন্বিত প্রচারণা মূলত ভারতীয় উৎস থেকে চালিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ভয় ও উত্তেজনা সৃষ্টি করা। তিনি উল্লেখ করেন যে, এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় টুল ব্যবহার করে পোস্টের পরিমাণ বাড়ানো এবং ভুয়া খবরের বিস্তার দ্রুততর করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, নির্বাচনের পূর্বে এধরনের মিথ্যা তথ্যের বিস্তার ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ফলস্বরূপ নির্বাচনী ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তারা আরও উল্লেখ করেন যে, যদি মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে নির্বাচনের পর সামাজিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে অপতথ্যের মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সহায়তা চাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক পরিবেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তথ্যের সত্যতা যাচাই ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রদানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।



