গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জানুয়ারি-জুন মুদ্রানীতি ঘোষণার পর সরকারী নীতির সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য অর্জনে বাধা পাচ্ছেন বলে জানালেন। তিনি উল্লেখ করেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাঠামো সম্পূর্ণ কার্যকর করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে নীতিসুদ হার ১০ শতাংশে স্থির রেখেছে, যা পূর্বের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। একই সঙ্গে রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে সরকারী নীতির সঙ্গে সমন্বয় না থাকলে এই হারই একা মূল্যস্ফীতি দমন করতে পারবে না।
সাম্প্রতিক তিন মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব এবং ফেব্রুয়ারি ও রোজা মাসের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে মার্চ মাসেও মুদ্রাস্ফীতি কমার সম্ভাবনা কমে গেছে। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি বাড়তে পারে।
গভর্নর সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বললেন, মুদ্রানীতির অন্যান্য লক্ষ্যগুলো—যেমন আর্থিক স্থিতিশীলতা ও রিজার্ভ বৃদ্ধি—সফলভাবে অর্জিত হয়েছে, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি রয়ে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, “এখানে মার্কেট পলিসির সঙ্গে রাজস্ব নীতির একটা সমন্বয় হতে হয়। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না।”
রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ার ফলে আর্থিক বাজারে তরলতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভবিষ্যৎ মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে গভর্নর সতর্ক করেছেন, আমলাতান্ত্রিকতার কারণে নীতি বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিতে পারে, ফলে বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। তিনি জোর দিয়ে বললেন, “যতটা পারা যায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের রিজার্ভ বেড়েছে, অর্থনীতির পূর্বাভাস ইঙ্গিত দেয়, মূল্যস্ফীতি আরও কমবে।”
নিত্যপণ্যের দাম, বিশেষ করে চাল, পেঁয়াজ ও মরিচের ক্ষেত্রে সরকারী আমদানি অনুমতি নিয়ে গভর্নর সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, পেঁয়াজের চাহিদা লক্ষ লক্ষ টন, তবে অনুমোদিত আমদানি মাত্র দেড় হাজার টন, যা “পুকুরে এক ফোটা পানি দেওয়ার মতো” এবং দাম কমাতে যথেষ্ট নয়। সব ধরনের ব্যবসায়ীকে আমদানি করার অনুমতি দিলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি দমন হবে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান। সমন্বিত নীতি গঠন করলে নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল মসৃণ হবে এবং মূল্যস্ফীতি দমন হবে বলে তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতিবিধি নতুন মুদ্রানীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি ৬.১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৭.২ শতাংশ। নতুন নীতিতে এই প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করা হয়েছে। যদিও ক্রেডিটের পরিমাণ বাড়ছে, তবে লক্ষ্য পূরণ না হওয়া নিয়ে গভর্নর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সামগ্রিকভাবে, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় না হওয়া বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারী নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, আমদানি অনুমতি সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের ক্রেডিট প্রবাহের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। এই বিষয়গুলো সমাধান হলে আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা ও মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়বে।



