লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে একটি রাবার নৌকা ডুবে ৫৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে, দুই নাইজেরিয়ান নারী বেঁচে গেছেন। নৌকায় মোট ৫৫ জন যাত্রী ছিল, যার মধ্যে দুইটি নবজাতকও অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনা শুক্রবারের প্রাতঃকালীন সময়ে ঘটেছে।
নৌকাটি লিবিয়ার আল-জাওয়িয়া শহর থেকে রাত ১১ টার কাছাকাছি রওনা হয়, এবং প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে জুয়ারা শহরের উত্তরে পানিতে ডুবে যায়। নৌকাটি অতিরিক্ত ভরে এবং পুরনো অবস্থায় ছিল, যা পানিতে ভাসতে অক্ষম করে তুলেছিল।
লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ শুক্রবারে দুই নারীকে উদ্ধার করে, যাদের অবস্থা তীব্র শক ও শারীরিক ক্ষতিতে ছিল। IOM দ্রুত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে, এবং তাদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করে। উভয় বেঁচে থাকা নারীই জানিয়েছেন যে, তাদের স্বামী ও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এই ঘটনার ফলে মোট ৫৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর দুইজনের বেঁচে থাকা একমাত্র দুঃখজনক সঞ্চার। নৌকায় ছিল বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের অভিবাসী ও শরণার্থী, যাঁরা ইউরোপে আশ্রয় খোঁজার জন্য লিবিয়াকে প্রস্থানবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করছিলেন।
IOM জানায়, ২০২৬ সালে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পারাপার পথে অন্তত ৫০০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। এই সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
গাদাফি শাসনের পতনের পর ২০১১ সাল থেকে লিবিয়া সাব-সাহারান আফ্রিকার অভিবাসীদের জন্য প্রধান রওনা পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। দেশীয় অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত শরণার্থী নীতি এই প্রবাহকে ত্বরান্বিত করেছে।
বেঁচে থাকা নারীরা জানান, নৌকাটি রাত ১১ টায় আল-জাওয়িয়া থেকে রওনা হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা পরে উল্টে যায়। এক নারী তার স্বামীকে হারিয়ে গেছেন, আর অন্য নারী তার দুই শিশুর মৃত্যুর বেদনা ভাগ করে নিয়েছেন। উভয়ই শোকের মধ্যে ছিলেন, তবে তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা সেবা পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
IOM দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে, বেঁচে থাকা নারীদের মৌলিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদান করে। এছাড়া, মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কনস্যুলেটের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
জানুয়ারি মাসে মধ্য ভূমধ্যসাগরে একাধিক অদৃশ্য জাহাজডুবি ঘটায়, যার ফলে ৩৭৫ জনের বেশি অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। শীতল আবহাওয়া এবং দুর্বল নৌকা ব্যবহারের ফলে এই সংখ্যা বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
এই ধরনের ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও, লিবিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা অব্যাহত রয়েছে। বহু অভিবাসী এখনও ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে চড়ে, নিরাপদ গন্তব্যের স্বপ্ন দেখছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই প্রবণতা থামাতে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।
লিবিয়ার অভ্যন্তরে মানবাধিকার পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের মতোই কঠিন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তারা টরচার, মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম, এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা শোষণের অভিযোগ তুলে ধরেছেন। সরকারী ও অ-সরকারী উভয় গোষ্ঠীর এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অভিবাসী পাচারকারী ও জাহাজ চালকদের জন্য লাভের আকর্ষণ বড়। তারা অতিরিক্ত লোকজনকে অতিরিক্ত ভরে, অপ্রতুল নৌকা ব্যবহার করে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই অবৈধ নেটওয়ার্কগুলোকে ভেঙে ফেলতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কঠোর শাস্তি প্রয়োজন।
সংযুক্ত জাতরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শরণার্থী নীতি বিভাগ উভয়ই লিবিয়ার অভিবাসী সংকট মোকাবেলায় ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। তারা লিবিয়ার সরকারকে মানবিক সহায়তা প্রদান, নিরাপদ শরণার্থী ক্যাম্প স্থাপন এবং পাচার নেটওয়ার্ক ধ্বংসে সহায়তা করার পরামর্শ দিয়েছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “লিবিয়ার বর্তমান অবস্থা একটি মানবিক জরুরি অবস্থা, যা শুধু লিবিয়ার নয়, পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।” তিনি আরও যোগ করেন, “ইউরোপীয় দেশগুলোকে শরণার্থী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি গঠন করতে হবে, যাতে মানবিক দিকটি অবহেলিত না হয়।”
২০২৫ সালে একই অঞ্চলে ঘটিত একাধিক জাহাজডুবি ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার গোষ্ঠী নিয়মিত সতর্কতা জারি করে, তবু কার্যকর পদক্ষেপের অভাবের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
অবশেষে, লিবিয়ার উপকূলে এই ট্র্যাজেডি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অভিবাসী নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং পাচার বিরোধী কৌশলগুলোকে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, ত্বরিত মানবিক সহায়তা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরনের মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হতে পারে।



