ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আজ প্রকাশিত ইলেকশন কমিশনের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা জানিয়েছে। কমিশন ১৩তম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটের সময় ভোটকেন্দ্রের চারশো গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করেছে। এই ঘোষণার পর টিআইবি উল্লেখ করেছে যে, ভোটারদের মৌলিক যোগাযোগের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে ক্ষুণ্ন করবে।
ইলেকশন কমিশনের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটের সময় ফোনের অপব্যবহার রোধ করা, তবে টিআইবির মতে এটি অতিরিক্ত বিস্তৃত এবং অযৌক্তিক। সংস্থার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তথ্যের মুক্ত প্রবাহের নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
টিআইবি সতর্ক করেছে যে, ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থা বাড়ানোর বদলে এমন নিষেধাজ্ঞা অংশগ্রহণের ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নতুন সন্দেহের সঞ্চার ঘটাতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় যেখানে মোবাইল ফোনই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম, সেখানে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, যদি ফোন ও প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করা লক্ষ্য হয়, তবে নির্দিষ্ট এবং যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। সম্পূর্ণভাবে ফোন নিষিদ্ধ করা মানে জরুরি পরিস্থিতিতে ভোটারদের মৌলিক যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কেটে ফেলা। তিনি এটিকে “মাথা কেটে মাথা ব্যথা দূর করার মতো” হিসেবে তুলনা করে সমালোচনা করেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা তথ্য প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, স্বচ্ছতা হ্রাস করে এবং জনগণের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা ক্ষয় করে। ভোটকেন্দ্রের নিকটে ফোন না থাকা মানে ভোটারদের জরুরি কল, পরিবারিক যোগাযোগ বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সময় দ্রুত সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
এছাড়া, ভোটকেন্দ্রের চারশো গজের মধ্যে ফোন নিষিদ্ধ করা স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন উত্থাপন করে। টিআইবি দাবি করে, এমন সিদ্ধান্ত নির্বাচন ব্যবস্থার ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার বদলে নতুন অস্পষ্টতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে যে, এই নিষেধাজ্ঞা সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের কাজকে কঠিন করে তুলবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা প্রধানত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে ছবি, ভিডিও ও সংবাদ প্রচার করে থাকেন।
পূর্ববর্তী নির্বাচনে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে; ভোটদুর্নীতি, হিংসা এবং অন্যান্য অনিয়মের প্রমাণ প্রায়শই ফোনের ক্যামেরা ও রেকর্ডিং থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। টিআইবি উল্লেখ করে, ফোনের ব্যবহার সীমিত করা মিডিয়া স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করবে এবং এমনকি হিংসা বা ভয় দেখানোর ঘটনা রেকর্ড করা কঠিন হয়ে যাবে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদি ভোটাররা জানে যে ভোটকেন্দ্রে ফোন না নিয়ে আসতে হবে, তবে অনেকেই নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভোটদান থেকে বিরত থাকতে পারেন। এই পরিস্থিতি ভোটার টার্নআউট কমিয়ে নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
টিআইবি ভবিষ্যতে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা সংশোধনের জন্য আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপের আহ্বান জানাবে। সংস্থা দাবি করে, নির্বাচন কমিশনকে ভোটারদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং স্বচ্ছতা বজায় রেখে নীতি গঠন করতে হবে।
এই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কিছু দল ভোটারদের নিরাপত্তা ও তথ্যের স্বতন্ত্র প্রবাহকে গুরুত্ব দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে কিছু দল নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে সীমিত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত পোষণ করেছে।
অবশেষে, ভোটের দিন পর্যন্ত এই বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। টিআইবি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যায়পরায়ণতা রক্ষার জন্য সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে।



