লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত জিনতান শহরে ৫৩ বছর বয়সী সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি, প্রাক্তন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির একমাত্র পুত্র, চারজন সশস্ত্র আক্রমণকারীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। ঘটনাটি গত সপ্তাহে গাদ্দাফির নিজ বাসভবনে ঘটেছে, যেখানে চারজন বন্দুকধারী গৃহপ্রবেশ করে গুলি চালায়।
গাদ্দাফি ২০১১ সালের ন্যাটো সমর্থিত অভ্যুত্থানের পর লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝখানে ছিলেন এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গতিপথে বড় পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
একজন ব্রিটিশ সাংবাদিকের মতে, যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এম-১৬ এবং ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল। তিনি জানান, এম-১৬ তাদের স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে গাদ্দাফির বাড়িতে আক্রমণ সংগঠিত করেছে এবং ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার সমর্থনও পাওয়া গেছে। এই দাবি লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা গাদ্দাফির মৃত্যুর কঠোর তদন্তের আহ্বান জানিয়ে, সংশ্লিষ্টদের দ্রুত বিচারকের সামনে আনার দাবি প্রকাশ করেছেন। মস্কো এই ঘটনার আন্তর্জাতিক আইনি পর্যালোচনা এবং দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে সাড়া দিয়েছে।
গাদ্দাফি এবং তার পিতার সময়কালে গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিভাজন লিবিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সাইফ গাদ্দাফি তার পিতার মতোই আফ্রিকাকে ডলারমুক্ত করে স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, যা আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের প্রভাব থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ছিল। এই ধারণা পশ্চিমা শক্তির জন্য কৌশলগত হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, গাদ্দাফির মৃত্যুর ফলে লিবিয়ার ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে এবং দেশের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠবে। গাদ্দাফি নির্বাচনী প্রার্থী হিসেবে তার উপস্থিতি কিছু গোষ্ঠীর জন্য স্থিতিশীলতার প্রতীক ছিল; তার অকাল মৃত্যু অনেক লিবিয়ানকে আশাহীন করে তুলেছে।
লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ তদন্ত শুরু করেছে, তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। গাদ্দাফির পরিবার এবং সমর্থকরা শোক প্রকাশের পাশাপাশি তদন্তের স্বচ্ছতা ও দ্রুততা দাবি করছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ডকে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের এক নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বহিরাগত গোপন সংস্থার হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। এই সন্দেহের ভিত্তিতে কিছু দেশ গাদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়ার রাজনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
লিবিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে নির্বাচনের সময় নতুন প্রার্থী ও গোষ্ঠীর উত্থান প্রত্যাশা করছেন, তবে গাদ্দাফির মৃত্যুর ফলে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে কোন দল বা গোষ্ঠী সফল হবে তা এখনো অনিশ্চিত। দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও বহিরাগত হস্তক্ষেপের মিশ্রণ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে জটিল করে তুলবে।
গাদ্দাফির মৃত্যু লিবিয়ার দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা ও লিবিয়ার নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নের মুখে থাকবে। দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।



