গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতের গভীরে ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার সংবাদ সংস্থার সদর দফতরে অগ্নিকাণ্ড, ভাঙচুর এবং গুলিবর্ষণ সংঘটিত হয়। ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি নিয়ে সমালোচনা তীব্র হয় এবং দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ ওঠে।
সেই রাতের ঘটনায় একাধিক জানালার কাচ ভেঙে ফেলা হয়, গৃহস্থালির সামগ্রী পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং সংস্থার কর্মীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, আক্রমণকারীরা অগ্নি শিখা ব্যবহার করে দহন ঘটিয়ে সংস্থার সম্পদ নষ্ট করার চেষ্টা করে।
ঘটনা ঘটার পরপরই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে অবিলম্বে ঘটনাস্থলে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়, তবে গৃহীত পদক্ষেপের ধীরগতির কারণে মিডিয়া ও নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা যায়। দেরিতে পৌঁছানোর জন্য পুলিশকে দায়ী করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী সমালোচনা প্রকাশ করে।
৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যানজটের কারণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করেন।
কমিশনার বলেন, “আক্রমণটি গভীর রাতে ঘটেছিল, তখন শহরের প্রধান সড়কগুলোতে তীব্র ট্রাফিক জ্যাম ছিল। সেই পরিস্থিতিতে আমাদের অফিসারদের সময়মতো ঘটনাস্থলে পাঠানো সম্ভব হয়নি।” তিনি এই ব্যাখ্যাকে দেরিতে পৌঁছানোর মূল কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে, দেরি হওয়ায় সৃষ্ট ক্ষতির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পুলিশ বিভাগের ওপরই পড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, “যে কোনো দেরি বা ত্রুটি হলে তা আমাদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে জবাবদিহি করতে হবে।”
কমিশনারের মন্তব্যে আরও উঠে আসে নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়ে সম্ভাব্য প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রভাব। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “নির্বাচনের পাঁচ-ছয় দিন আগে যদি প্রতিবাদকারীরা সরকারপ্রধানের বাসভবনের সামনে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারব?” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন।
এই হামলা ঘটার পটভূমিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর পরের উত্তেজনা উল্লেখযোগ্য। তার মৃত্যুর পরপরই প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে আক্রমণ ঘটে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে বিশ্লেষণ করা হয়।
হামলায় জড়িত সন্দেহভাজনদের ওপর তদন্ত চালিয়ে এখন পর্যন্ত ২৮ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কয়েকজনকে অস্থায়ীভাবে জেলখানায় রাখা হয়েছে, অন্যরা আদালতে হাজির হওয়ার জন্য রিলিজ করা হয়েছে।
সাংবাদিক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। তারা জোর দিয়ে বলেন, “মুক্তমনা সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি দুর্বল হবে।”
আইনি দিক থেকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ মামলাটি বিশেষ অপরাধ আদালতে দায়ের করেছে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে। আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনটি নির্দেশ করে যে, ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সাড়া প্রদান প্রোটোকল শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সম্পদ বরাদ্দের আহ্বান করা হয়েছে।



