ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ৮ ফেব্রুয়ারি রবিবার অনুষ্ঠিত হওয়া বার্ষিক বিমান বাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে সভায় উপস্থিত হননি। এই অনুষ্ঠানটি দেশের বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদেরকে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের ঐতিহ্যবাহী সুযোগ প্রদান করে। সভার তারিখটি ১৯৭৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইরানের বিপ্লবী নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, তার স্মরণে নির্ধারিত।
বার্ষিক এই সমাবেশটি ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ঘটনার বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রতিটি বছর একই দিনে বিমান বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কমান্ডাররা সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে শাসন গ্রহণের পর থেকে খামেনি ধারাবাহিকভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আসছেন, এমনকি কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও উপস্থিত ছিলেন। তার উপস্থিতি ইরানের সামরিক নীতি ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই বছর, খামেনি উপস্থিত না হওয়ায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা অনুমান উত্থাপিত হয়েছে। তার পরিবর্তে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল সাইয়্যেদ আব্দুর রহিম মুসাভি বিমান বাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক পরিচালনা করেন। মুসাভি সভার সময় সামরিক প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা এবং আকাশীয় কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন বলে জানা যায়।
বার্ষিক সমাবেশের ঐতিহ্যগত পটভূমি ১৯৭৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, যখন রুহুল্লাহ খোমেনি তার অনুসারীদের সামনে স্বাধীনতা ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন, তার সঙ্গে একদল বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। সেই শপথের স্মরণে প্রতিটি বছর একই দিনে বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, যা সামরিক ও রাজনৈতিক সংহতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
খামেনির অনুপস্থিতি নিয়ে কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে ইরানের এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা তাকে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে বাধা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরের সামরিক আক্রমণের হুমকি পুনরায় প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের ফলে ইরানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়ে এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বৈঠকে নিরাপত্তা বিষয়ক অতিরিক্ত আলোচনা হতে পারে।
ইসরায়েলও ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ ও সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ও আঞ্চলিক নীতির প্রতি কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই ধরনের বহুমুখী হুমকি ইরানের সামরিক নেতৃত্বকে কৌশলগতভাবে সতর্ক থাকতে বাধ্য করেছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল মুসাভি বৈঠকে উল্লেখ করেন যে, বিমান বাহিনীর প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলোকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শক্তিশালী করা হবে। তিনি অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা ও প্রযুক্তিগত আপগ্রেডের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যা ইরানের আকাশীয় ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
এই পরিবর্তন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিদ্যায়ও প্রভাব ফেলতে পারে। খামেনির অনুপস্থিতি কিছু বিশ্লেষকের মতে, তার স্বাস্থ্যের অবনতি বা নিরাপত্তা উদ্বেগের ইঙ্গিত হতে পারে, যদিও সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। ভবিষ্যতে তিনি কীভাবে এই ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠানে ফিরে আসবেন বা নতুন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করবেন, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বর্তমানে সর্বোচ্চ উত্তেজনায় পৌঁছেছে। ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকি এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য আক্রমণ পরিকল্পনা ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে পুনর্গঠন করার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুসাভির বৈঠক ইরানের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ৩৭ বছর পর প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বার্ষিক বিমান বাহিনীর সভা এড়িয়ে গেছেন, এবং মেজর জেনারেল সাইয়্যেদ আব্দুর রহিম মুসাভি তার পরিবর্তে উপস্থিত হয়ে সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই ঘটনা ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



