ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জেলায় নির্বাচনী উত্তেজনা শীর্ষে পৌঁছেছে। ১১টি আসনের মধ্যে আটটি আসনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্ব-দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী দৌড়াচ্ছেন, যা দ্বি, ত্রি ও চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি উভয়ের মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী উপস্থিত, যা দেশের একমাত্র এমন কেস।
ময়মনসিংহের ভোটারদের মধ্যে এই বছরের নির্বাচনী তাপ তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ শিক্ষা, শিল্প ও লোকসংস্কৃতির তীর্থস্থান হিসেবে এই জেলা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির কেন্দ্রবিন্দু। বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলীয় নীতির সঙ্গে অসন্তোষ প্রকাশ করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনী মঞ্চে নামছেন, ফলে ঐতিহ্যবাহী দলীয় কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
প্রতিটি আসনে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের পছন্দের পরিসরও বিস্তৃত হচ্ছে। কিছু আসনে দুই প্রার্থীর লড়াই, অন্যগুলোতে তিন বা চারজন প্রার্থী একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা ভোটের ভাগাভাগি জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে ফুলবাড়িয়া জেলায় উভয় প্রধান দলই নিজেদেরই বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থনকারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
ফুলবাড়িয়া আসনের রাজনৈতিক দৃশ্যকে আরও স্পষ্ট করতে, শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে রোডে ময়মনসিংহের পথে রওনা হওয়া হয়। ঢাকা ও ময়মনসিংহের মধ্যে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দূরত্ব, এবং শহরের বাউন্ডারি রোড থেকে সিএনজি চালিত অটো রিকশা দিয়ে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত ২০ কিলোমিটার যাত্রা সম্পন্ন হয়।
সিএনজি চালক শাকিলের মন্তব্যে দেখা যায়, এই অঞ্চলে এখন ঘোড়া ও ফুটবলের প্রতীক বেশি শোনা যায়, ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লার মতো ঐতিহ্যবাহী চিত্রের তুলনায়। তিনি জানান, যাত্রীরাও এই দুই প্রতীকের ভিত্তিতে ভোটের সম্ভাবনা নির্ণয় করছেন, যা স্থানীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
ফুলবাড়িয়া বাজারে পৌঁছে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে গিয়ে ৭০ বছর বয়সী মুচি দিনেন্দ্র ঋষির মতামত জানা যায়। তিনি বলেন, যাকে বিপদে সাহায্য করা হয়েছে, তাকে ভোট দেবেন, এবং এই নির্বাচনেও একই নীতি অনুসরণ করবেন। তার কথায় স্থানীয় ভোটারদের জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
বাজারের দুই পাশে বোরো ধানের চারা রোপণ করা কৃষকদের দৃশ্য দেখা যায়, যা এই এলাকার অর্থনৈতিক ভিত্তি কৃষিতে নির্ভরশীল তা পুনরায় নিশ্চিত করে। উপজেলা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়া উপজেলায় কৃষি প্রধান আয় উৎস, এবং এই মৌসুমে ধান চাষের পরিমাণ বাড়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
বালিয়ান ইউনিয়নের একজন কৃষক, সোহাগ আলম, নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলে পরিচয় দিয়ে জানান, এই বছর তাদের দল উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি দলীয় প্রতীকের বাইরে ভোট দিতে অনিচ্ছুক, তবে ঘোড়া ও ফুটবলের প্রতীকের অবস্থান দেখে ভোটের সিদ্ধান্ত নেবেন।
সোহাগের মতামত স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে প্রচলিত প্রতীকী ভোটের প্রবণতা তুলে ধরে। ঘোড়া ও ফুটবল, যা ঐতিহ্যবাহী কৃষি-সম্পর্কিত চিত্রের পরিবর্তে আধুনিক ক্রীড়া ও গতি-প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, এখন ভোটারদের মনোভাব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ময়মনসিংহ-৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪,১২,৮৪৩, যা ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এই বৃহৎ ভোটার ভিত্তি এবং বহুমুখী প্রার্থী তালিকা নির্বাচনের ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলেছে, এবং পরবর্তী পর্যায়ে জোট গঠন বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি দলীয় সংহতি পরীক্ষা করবে এবং ফলাফল অনুযায়ী ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন আনা হতে পারে। যদি বিদ্রোহী প্রার্থী উল্লেখযোগ্য ভোট সংগ্রহ করে, তবে প্রধান দলগুলোকে প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, দলীয় প্রার্থীর জয় হলে বিদ্রোহী আন্দোলনকে দমন করা সম্ভব হবে। এই পরিস্থিতি ময়মনসিংহের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে।



