বাংলাদেশ ব্যাংক গত সোমবার জানুয়ারি‑জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত জানায়। মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে ৭ শতাংশের নিচে মূল্যস্ফীতি নামানো ছাড়া অন্যান্য সূচকগুলোতে নীতি সফল হয়েছে।
মুদ্রানীতির ঘোষণার সময় বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট‑টু‑পয়েন্ট ভিত্তিতে মোট মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্বের ডিসেম্বর মাসের ৮.২৯ শতাংশের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও রোজার সময়কালের ব্যয়বহুলতা, এবং মার্চ মাসে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি হ্রাসের অনিশ্চয়তা মুদ্রানীতির কঠোরতা বজায় রাখতে প্রভাব ফেলবে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো হবে না। তিনি বলেন, “একটি টার্গেট পূরণ না হলে গুলি ছোড়া ঠিক হবে না,” এবং এ মুহূর্তে নীতি হার হ্রাসের কোনো পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে তিনি রিজার্ভের অবস্থানকে শক্তিশালী বলে উল্লেখ করে, “আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ আমাদের ভালো অবস্থানে আছে,” এবং অগাস্ট থেকে রিজার্ভ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ নীতি সুদহার বজায় রাখার মাধ্যমে মুদ্রা বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মুদ্রার মানকে সমর্থন দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শ অনুসারে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো হবে না, তাই বর্তমান নীতি হার ১০ শতাংশই থাকবে।
মুদ্রানীতির অন্যান্য মূল উপাদানও প্রকাশিত হয়েছে। স্লিপিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (SLF) রেট ১১.৫ শতাংশে স্থির রাখা হয়েছে, যা পূর্বের স্তরের সমান। ডিপোজিট রেট ফ্যাসিলিটি (SDF) রেট ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে, ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের খরচ কিছুটা হ্রাস পাবে।
বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির পূর্বাভাসও আপডেট করা হয়েছে। নতুন অনুমান অনুযায়ী, ঋণ বৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে পৌঁছাবে, যা পূর্বের ৭.২ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার ৬.১ শতাংশ ছিল, যা নতুন পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ত্বরান্বিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
মুদ্রানীতির মূল উদ্দেশ্য হল নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে অর্থ সরবরাহের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানুয়ারি‑জুন সময়কালে এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ করেছে এবং ভবিষ্যতে মুদ্রা সরবরাহের পরিকল্পনা মুদ্রানীতিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি হ্রাসে চ্যালেঞ্জের মুখে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রা স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে। রিজার্ভের শক্তিশালী অবস্থান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সমর্থন, এবং বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির প্রত্যাশা মুদ্রানীতির মূল দিকগুলোকে সমর্থন করবে। তবে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে ব্যয়বহুলতা এবং রোজার প্রভাব মূল্যস্ফীতি হ্রাসে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা নীতি সিদ্ধান্তে সতর্কতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।



