ইলেকশন কমিশন (ইসিসি) ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ১৩তম পার্লামেন্টারি নির্বাচন ও রেফারেন্ডামের দিন ভোটকেন্দ্রের চারশো গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধের আদেশ প্রকাশ করেছে। নির্দেশটি দেশের সব ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রযোজ্য এবং ইসিসি সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চক্রবদ্ধ নোটিশের মাধ্যমে রিটার্নিং অফিসারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রেরিত নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ভোটকেন্দ্রের ভিতরে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কিছু কর্মীই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন। এতে অন্তর্ভুক্ত হলেন কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রেসিডিং অফিসার, পুলিশ ইন-চার্জ, আনসার সদস্য, সাধারণ আনসার বা ভি.ডি.পি. কর্মী এবং ইলেকশন সিকিউরিটি ২০২৬ অ্যাপ ব্যবহারকারী দুইজন আনসার সদস্য। অন্য সকল ভোটার, কর্মী ও দর্শনার্থীর জন্য ফোন বহন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
নির্দেশের প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠন ইসিসি-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে, ভোটকেন্দ্রের নিকটে ফোন না থাকলে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কাজের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে, ভোটের সময় কোনো অনিয়ম ঘটলে তা রিয়েল-টাইমে নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিরোধী গোষ্ঠীর মন্তব্যে এই নিষেধাজ্ঞাকে অপ্রয়োজনীয়, অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা এবং স্বচ্ছতার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা যুক্তি দিয়েছে যে, ভোটের সময় নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তি ও প্রকাশের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এছাড়া, নোটিশে সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য কোনো ব্যতিক্রম উল্লেখ না থাকায় তাদের কাজের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী উল্লেখ করেছেন, ভোটকেন্দ্রের নিকটে ফোন না থাকলে নাগরিকরা যদি কোনো অনিয়ম লক্ষ্য করেন, তা তৎক্ষণাৎ রেকর্ড করতে পারবে না, ফলে অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সিদ্ধান্তের প্রত্যাহার ও সংশোধনের দাবি তোলেন। অনুরূপভাবে, বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি গ্রুপও ইসিসি-কে অনুরোধ করেছে যে, ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করা হোক।
এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং মিডিয়ার কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। যদি ফোনের ব্যবহার সীমিত করা হয়, তবে ভোটের সময় ঘটতে পারে এমন অস্বাভাবিকতা বা ধোঁকাবাজি রেকর্ড করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা ভোটের ফলাফলের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের সুযোগও সীমিত হতে পারে।
ইসিসি এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি যে, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য কোন বিশেষ অনুমতি থাকবে কি না। তবে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন এই বিষয়ে স্পষ্টতা চেয়ে ইসিসি-কে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান এবং প্রয়োজনে নীতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানাচ্ছে। ভবিষ্যতে যদি এই নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকে, তবে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বাড়বে যে, তারা কীভাবে ভোটের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
পরবর্তী ধাপে, ইসিসি-কে সামাজিক মাধ্যমে উত্থাপিত উদ্বেগের উত্তর দিতে হবে এবং সম্ভবত নোটিশে সংশোধনী যুক্ত করে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট ছাড় প্রদান করতে পারে। এছাড়া, ভোটের দিন নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যেমন ইলেকশন সিকিউরিটি ২০২৬ অ্যাপের ব্যবহার, বাড়িয়ে তোলা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ও তার পরিণতি দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জনগণের বিশ্বাসের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



