জাতীয় নাগরিক দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে এক নির্বাচনী ভাষণে ঘোষণা করেন, যদি তার দল ও ১১-দলীয় জোট সরকার গঠন করে, তবে মন্ত্রীদের সপ্তাহে অন্তত এক দিন এবং সচিবদের দুই দিন সাধারণ গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে।
বক্তব্যের সময় নাহিদ ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আর কোনো আলাদা গাড়ি বা সেবা থাকবে না; সবাইকে সাধারণ নাগরিকের মতো বাস, রিকশা বা ট্রেনে যাত্রা করতে হবে। তিনি এই পদক্ষেপকে “বৈপ্লবিক পরিবর্তন” বলে উল্লেখ করেন এবং জনগণের সঙ্গে সমতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতীয় নাগরিক দল ৩০টি আসনে “শাপলা কলি” চিহ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের অংশ। দলটি এই নির্বাচনী চক্রে ১৮টি মূল প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে, যার কেন্দ্রে ন্যায়বিচার, সংস্কার এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় সংঘটিত গুম-খুন, নির্যাতন এবং ব্যাংক লুটের দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের নিশ্চয়তা অন্যতম। নাহিদ ইসলাম বলেন, এই অপরাধগুলোকে আইনের শাসনে আনা তাদের অগ্রাধিকার হবে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
যুব প্রজন্মের জন্য নাহিদ ইসলাম বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যেখানে ১৮ বছর বয়সের বেশি সকল তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে রূপান্তর করার লক্ষ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সংস্কারেও দলটি সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ইশতেহার দেয়। ফ্যাসিবাদী সহযোগী হিসেবে বিবেচিত পুলিশকে “জনসেবক বাহিনী” নামে পুনর্নামকরণ করা হবে এবং এর কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে।
সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় তানাশাহি রাষ্ট্র হবে না; বরং তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক রাষ্ট্রের মডেল অনুসরণ করবে, যেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় এবং রাষ্ট্র আইন ও ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
নারী অধিকার সংরক্ষণে দলটি শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের কথা উল্লেখ করে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সমান সুযোগের জন্য নীতি প্রণয়ন করা হবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক দল নাহিদ ইসলামের এই প্রস্তাবগুলোকে অতি আদর্শবাদী এবং বাস্তবায়নে কঠিন বলে সমালোচনা করেছে। তারা দাবি করে, সরকারী কর্মীদের জন্য গণপরিবহন বাধ্যতামূলক করা কর্মদক্ষতা হ্রাসের পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয় বাড়াতে পারে। এছাড়া, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং পুলিশ পুনর্গঠনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যযুক্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে।
এদিকে, জাতীয় নাগরিক দল সমর্থকরা নাহিদের ঘোষণাকে জনগণের সঙ্গে সংযোগের নতুন মাইলফলক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে এবং দাবি করেছে, এই ধরনের নীতি বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি ও বিশেষাধিকার হ্রাস পাবে। তারা বিশ্বাস করে, এই প্রতিশ্রুতিগুলো নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নাহিদ ইসলাম শেষ করে বলেন, অতীতের ব্যর্থতা স্বীকার করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে ভোটারদের আরেকটি সুযোগ প্রার্থনা করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।



