ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নতুন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে অন্তত তৃতীয়াংশের বেশি প্রার্থী অনুমোদিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে, নির্বাচন কমিশনের প্রচারণা সামগ্রী অপসারণের নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রায় আট‑এক দশক প্রার্থী তা মানেনি।
প্রতিবেদন অনুসারে, মোট প্রার্থীর ৩৪ শতাংশের বেশি নির্ধারিত আর্থিক সীমা অতিক্রম করেছে। এই প্রার্থীরা ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সময় গড়ে এক কোটি উনিশ লাখ একষট্টি হাজার তিনশো দশ টাকা ব্যয় করেছে।
অধিকাংশ প্রার্থী অনুমোদিত সময়ের আগেই প্রচারণা শুরু করে, ফলে প্রচার সামগ্রী, রেলি, পোস্টার ইত্যাদির জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। গবেষক মো. মাহফুজুল হক উল্লেখ করেন, প্রাথমিক পর্যায়ে দল ও প্রার্থীরা প্রচারণা চালু করার জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সম্পদ ব্যবহার করেছে, যা ব্যয়সীমা অতিক্রমের মূল কারণ।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রার্থীদের মাঠ থেকে প্রচারণা সামগ্রী সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও ৮১.৩ শতাংশ প্রার্থী তা মেনে না চলার অভিযোগে মুখোমুখি হয়েছে। নির্দেশনা না মানার ফলে কিছু প্রার্থী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে হুমকি-ধমকি দিয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রাক-নির্বাচনী পরিবেশে সহিংসতা এবং কর্তৃত্ববাদী শক্তির সক্রিয়তা উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু, নারী ও প্রতিবন্ধীসহ সব ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, এবং ফলাফল গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তোলা উচিত।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও এই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে, তবেই শান্তিপূর্ণ ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও যোগ করেন, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে সকল স্টেকহোল্ডারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রতিবেদনটি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। টিআইবের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসির নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধারাবাহিক দুর্বলতা রয়েছে, যার ফলে জনগণের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে গেছে।
প্রাক-নির্বাচনী পর্যায়ে দেখা অনিয়ম, অপ্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিতর্কিত নীতি প্রয়োগের ফলে ইসির কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে, ব্যয় সীমা অতিক্রমের ব্যাপকতা এবং প্রচারণা সামগ্রী অপসারণের নির্দেশনা উপেক্ষা করা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে টিআইবের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনের আগে এবং চলাকালীন সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি ভোটারদের অংশগ্রহণের ইচ্ছাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি ইসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে নির্বাচনের ফলাফলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ শাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। অতএব, ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কঠোর প্রয়োগ, প্রচারণা সামগ্রী অপসারণের ত্বরিত বাস্তবায়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা নির্বাচনের বৈধতা রক্ষায় অপরিহার্য।
টিআইবের এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং প্রশাসনের জন্য সতর্কতা স্বরূপ কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত সংস্কার ও তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর না হলে, ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



