যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি আজ ওয়াশিংটন ডি.সিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিয়েসন গ্রিয়ার অংশ নেন। স্বাক্ষরের সময় শর্তগুলোকে দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে এবং শুল্ক হারে সম্ভাব্য হ্রাসের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বাণিজ্য উপদেষ্টা ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরাসরি স্বাক্ষরে উপস্থিত হবেন, তবে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়ের কারণে তারা শারীরিকভাবে অংশ নিতে পারেননি। উভয় কর্মকর্তাই ভার্চুয়াল সংযোগের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি অনুসরণ করবেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচজনের একটি দল ওয়াশিংটনে রওনা হয়েছে। দলের মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইচ উদ্দিন খান অন্তর্ভুক্ত। দলটি চুক্তির কপি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে, যেখানে বাংলাদেশ দলের সদস্যরা তা উপস্থাপন করেছেন।
চুক্তির স্বাক্ষরে শেখ বশিরউদ্দীন ঢাকায় এক পাশে স্বাক্ষর করেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির স্বাক্ষর ওয়াশিংটনে সম্পন্ন হয়। স্বাক্ষরিত নথি দু’পাশে বিনিময় করা হবে এবং উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে তা প্রদান করা হবে।
দুই দেশের বাণিজ্য পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ ৬০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি করে এবং প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। এই গঠনগত পার্থক্য বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করে, যা চুক্তির মাধ্যমে আরও বাড়তে পারে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা, তুলা, বিমান ও বিমান যন্ত্রাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ইত্যাদি পণ্যের আমদানি শুরু করেছে। এই পণ্যগুলো মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, শুল্ক হারে সম্ভাব্য হ্রাসের ফলে আমদানি খরচ কমে উৎপাদন খরচও হ্রাস পেতে পারে, যা রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়াবে। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকদের ওপর প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, তাই বাজারে সমন্বয়মূলক নীতি প্রয়োজন হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ সরকার দ্রুতই সংশ্লিষ্ট নীতি ও বিধি প্রণয়ন করবে, যাতে নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুল্ক সংগ্রহ ও রপ্তানি-আমদানি নথিপত্রের সমন্বয় তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে নতুন পণ্য তালিকা প্রস্তুত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করছে। লক্ষ্য হল আমদানি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি পণ্যের বাজার প্রবেশ সহজতর করা।
বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, শুল্ক হ্রাসের ফলে আমদানি মূল্যের হ্রাস পণ্যভিত্তিক মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, যা বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়াতে পারে।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্য রক্ষায় একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। যদিও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, বাস্তবায়ন পর্যায়ে নীতি সমন্বয়, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং শিল্প সংস্থার প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি শুল্ক হারে সম্ভাব্য হ্রাস, নতুন পণ্য আমদানি এবং রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দেবে। তবে স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা এবং নীতি বাস্তবায়নের গতি নির্ধারণ করবে চুক্তির প্রকৃত প্রভাব।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকার শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে, রপ্তানি পণ্যের মানোন্নয়ন এবং আমদানি পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেবে। এই দিকগুলোই দেশের বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হবে।



