সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের সোয়ালিয়া গ্রামে অবস্থিত পাবলিক লাইব্রেরি, স্থানীয় শিশু ও যুবকদের জন্য পাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সেবা প্রদান করে। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি শিক্ষার সুযোগ ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে কাজ করছে।
শহরের সদর দপ্তর থেকে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার দূরে শ্যামনগর উপজেলা সদর, আর সেখান থেকে আরও ১৬ কিলোমিটার অতিক্রম করে সোয়ালিয়া গ্রাম পৌঁছানো যায়। পূর্বে ছয়টি ছোট গ্রাম মিলিয়ে ‘ছোটকুপট’ নামে পরিচিত ছিল; একটি খালের কারণে এই অঞ্চল দুই ভাগে বিভক্ত, যার এক পাশে সোয়ালিয়া, বয়ারসিং ও সাপেরদুনে গ্রাম এবং অন্য পাশে যোগিন্দ্রনগর, ছোটকুপট ও হেঞ্চি গ্রাম অবস্থিত।
একটি তুলনামূলকভাবে ছোট, তিনতলা ভিত্তি নিয়ে নির্মিত একতলা ভবনে লাইব্রেরি কাজ করে। ভবনের ছাদ ও জানালার মাধ্যমে প্রবেশ করা আলো পুরো এলাকার জন্য জ্ঞান ও আশার আলো ছড়িয়ে দেয়। দুর্যোগের সময় আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহারযোগ্য এই কাঠামো, স্থানীয় মানুষদের নিরাপদ স্থান প্রদান করে।
লাইব্রেরির প্রধান কাজ হল বই ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, তবে এটি শীতের পোশাক বিতরণ, গাছ রোপণ অভিযান এবং বিভিন্ন দক্ষতা প্রশিক্ষণও আয়োজন করে। শিশুদের জন্য শব্দার্থ, রচনা, টাইপিং ও পাঠ প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা তাদের বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জাগ্রত হয় এবং গ্রামবাসীর জীবনমান উন্নত হয়।
প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা আবু সাঈদ, যিনি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অফিসার। ২০১০ সালে ইউরোপীয় কমিশনের স্কলারশিপের মাধ্যমে ইতালিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময় তিনি লাইব্রেরি গড়ার ধারণা পান। একই সময়ে উত্তর ক্যারোলিনার ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনার একজন অধ্যাপকের ক্লাসে তিনি এই স্বপ্ন প্রকাশ করেন, এবং ২২টি দেশের ২৫ সহপাঠীর সমর্থন পেয়ে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হন।
দেশে ফিরে এসে আবু সাঈদ স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে আলোচনা করে পারিবারিক জমিতে ৩৬০ বর্গফুট জায়গায় লাইব্রেরি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ভিত্তি স্থাপনের কাজ ২০ মে ২০১২ তারিখে সম্পন্ন হয় এবং দুই বছর পর, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে উন্মুক্ত করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার বিদেশি বন্ধুরাও উপস্থিত ছিলেন, যা প্রকল্পের আন্তর্জাতিক সংযোগকে তুলে ধরেছে।
আজকের দিনে লাইব্রেরিতে দুইজন বেতনভুক্ত খণ্ডকালীন সহকারী কর্মী কর্মরত, এবং মোস্তফা হাসা নামের একজন লাইব্রেরিয়ান প্রধান দায়িত্ব পালন করছেন। তারা বইয়ের সংরক্ষণ, পাঠকসেবার সমন্বয় এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করেন।
সোয়ালিয়া গ্রামে ছোট ছেলে-মেয়েরা এখন নিয়মিত লাইব্রেরি ভিজিট করে, যেখানে তারা নতুন জ্ঞান অর্জন করে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন গড়ে তোলে। বইয়ের আলোকসজ্জা তাদের জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করেছে, যা পূর্বে সীমিত সুযোগের কারণে দূরে থাকত।
গ্রামবাসীর বেশিরভাগ পরিবার দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল, এবং শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় শিশুরা প্রায়শই স্কুল ছেড়ে কাজ করতে বাধ্য হতো। লাইব্রেরির উপস্থিতি শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে এবং পরিবারকে অতিরিক্ত আয়ের উৎস প্রদান করতে সহায়তা করছে।
যদি আপনি আপনার সন্তানকে পাঠের প্রতি আগ্রহী করতে চান, তবে নিকটস্থ পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়মিত ভিজিটের পরিকল্পনা করুন এবং সেখানে অনুষ্ঠিত হওয়া কর্মশালা ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিন। আপনার এলাকার শিক্ষামূলক সম্পদগুলো কীভাবে ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে একবার ভাবুন এবং সম্ভব হলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করুন।



