জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন বাকি থাকায়, অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিপরিষদে বিদায়ের পরিবেশ গড়ে উঠলেও, বড় চুক্তি ও নতুন প্রকল্পের অনুমোদনের গতি থেমে নেই। উপদেষ্টাদের মধ্যে প্রস্থানের ইচ্ছা প্রকাশের মাঝেও, সরকার চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নৌযান ক্রয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের নন‑ডিসক্লোজার চুক্তি সহ বহু উচ্চমূল্যের চুক্তি সম্পন্ন করছে।
ইলেকশন শিডিউল ঘোষণার পর সাধারণত রুটিন কাজের সীমা নির্ধারিত হয়, তবে ১ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ২৫ দিনে ৬৪টি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে, যার মোট ব্যয় ১,০৬,৯৯৩ কোটি টাকা। এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৪০টি সম্পূর্ণ নতুন এবং তাদের মূল্য ৭৯,৩৫৬ কোটি টাকা, যা শেষ মুহূর্তে অনুমোদিত সবচেয়ে বড় ব্যয়।
বড় চুক্তিগুলোর মধ্যে চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নৌযান ক্রয়ের চুক্তি, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের নন‑ডিসক্লোজার চুক্তি অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও, নতুন বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের অনুমোদন ধারাবাহিকভাবে চলছে, যা সরকারকে আর্থিক দায়িত্বের নতুন স্তরে নিয়ে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হল এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের চাপ, পাশাপাশি বহুল পরিমাণে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঋণের বোঝা। এই আর্থিক অবস্থা নতুন সরকারকে গ্রহণ করতে হবে, যা শুরুর থেকেই কঠিন আর্থিক পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, নতুন সরকারকে এই দায়বদ্ধতা গ্রহণের ফলে আর্থিক নীতি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উচ্চ ব্যয় এবং ঋণের বোঝা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট ঘাটতি কমাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
দুই বছর আগে পর্যন্ত, অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১৩৫টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মোট ব্যয় প্রায় দুই লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। সাধারণত, রাজনৈতিক সরকার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বহু সভা স্থগিত রাখে, তবে এই সরকার তফসিলের পরও সপ্তাহে একাধিক মেগা প্রকল্প অনুমোদন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
বিরোধী দল ও বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, শেষ মুহূর্তে অনুমোদিত এই প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট কিছু এলাকার রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপকে ভোটার ভিত্তি শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষত, কিছু প্রকল্পের অবস্থান ও প্রকৃতি এমন যে, তারা নির্দিষ্ট নির্বাচনী জেলায় উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বিরোধী দলগুলো সরকারকে সমালোচনা করে বলছে যে, তফসিলের পরেও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও চুক্তি অনুমোদন করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে নতুন সরকারকে আর্থিক দায়বদ্ধতা, ঋণ সেবা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপের মুখে দাঁড়াতে হবে। বাজেট ঘাটতি পূরণ ও সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার জন্য আর্থিক সম্পদ সীমিত হওয়ায় নীতি নির্ধারণে কঠিন সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, এই চুক্তি ও প্রকল্পের অনুমোদন নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। নতুন সরকারকে এই দায়বদ্ধতা গ্রহণের পর আর্থিক নীতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং জনসেবা প্রদান ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকার যে বৃহৎ আর্থিক চুক্তি ও প্রকল্প অনুমোদন করেছে, তা নতুন সরকারের জন্য আর্থিক দায়বদ্ধতা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী শাসনকালের নীতি দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



