রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১১ঃ৫৯ মিনিটে ঢাকা শহরের শাহবাগ মোড় থেকে শুরু হওয়া শেকল ভাঙার পদযাত্রা, যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও নারী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ও দ্রুত ন্যায়বিচার দাবি করে অনুষ্ঠিত হয়। নারী অধিকার, মানবাধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রের কর্মীসহ প্রায় দুইশো নারী-পুরুষ অংশগ্রহণকারী, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রওনা হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে সমাপ্তি টানে।
পদযাত্রা শাহবাগ থেকে কাঁটাবন, সাইয়েন্সল্যাব, কলাবাগান, ধানমন্ডি ৩২ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অতিক্রম করে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা স্লোগানযুক্ত প্লেকার্ড ও মশাল হাতে নেমে দাঁড়ায়। “নারী থেকে নারীতে, বিদ্রোহ ছুঁয়ে যাক”, “রোকেয়ার বাংলায়, নারী বিদ্বেষের কোনো জায়গা নেই” ইত্যাদি স্লোগান শোনা যায়, যা নারীর নিরাপত্তা ও সমতার দাবি স্পষ্ট করে।
প্রতিবাদকারীরা উল্লেখ করেন, রাতের সময়ে নারীকে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দোষারোপ করা সামাজিক ট্যাবু ভাঙা প্রয়োজন। তারা বলেন, “দিন হোক বা রাত, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব”। এ সঙ্গে তারা যৌন অপরাধের শিকারদের জন্য দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে দশটি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন।
পদযাত্রার অন্যতম সংগঠক ইশাবা শুহরাত, যিনি গবেষক হিসেবেও কাজ করেন, উল্লেখ করেন যে পূর্বের স্বৈরাচারী শাসন ও অন্তর্বর্তী সরকারে নারী নির্যাতনের মামলাগুলো যথাযথভাবে বিচার হয়নি। তিনি বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে অনুরোধ করেন, “বসুন্ধরা গ্রুপের সায়েম সোবহান আনভীর, আনভীর জুয়েলার্সের সাফাত আহমেদ ও অনুরূপ শিল্পপতি-ধনকুবেরদের বিচার নিশ্চিত করা হোক, যাঁরা রাজনৈতিক সংযোগের কারণে অব্যাহতি পেয়েছেন”।
শুহরাত আরও জানান, পাহাড়ি অঞ্চলে নারীরা বিভিন্ন রূপে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তবে সেসব ঘটনার খবর মূলধারার মিডিয়ায় কমই প্রকাশ পায়। তিনি দাবি করেন, “এই ধরনের ঘটনা মিডিয়ায় তুলে ধরা হোক এবং আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হোক”।
অন্য সংগঠক ও কর্মী প্রাপ্তি তাপসী, যিনি পূর্বের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নারীদের সক্রিয় ভূমিকা উল্লেখ করেন, বলেন, “অভ্যুত্থানের পরও নারীদের প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে”। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “নারীকে কেবল প্রতিবাদে নয়, দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সুরক্ষা দিতে হবে”।
পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা একত্রে সরকারকে আহ্বান জানান, যাতে যৌন অপরাধের শিকারদের জন্য দ্রুত তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ ও ন্যায়সঙ্গত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। তারা বিশেষ করে আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে দৃষ্টান্তমূলক রায়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
প্রদর্শনী চলাকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল সীমিত, তবে অংশগ্রহণকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে স্লোগান ও মশাল দিয়ে তাদের দাবি প্রকাশ করেন। রাস্তায় গাড়ি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়, তবে কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা ঘটেনি।
পদযাত্রার সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে একত্রে দাঁড়িয়ে, সরকারের কাছ থেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে সমাপনী স্লোগান উচ্চারণ করেন। এই প্রতিবাদটি দেশের বিভিন্ন শহরে সমানভাবে পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারি সূত্র থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে মানবাধিকার সংস্থা ও নারীর অধিকার গোষ্ঠী এই পদযাত্রাকে নারীর নিরাপত্তা ও সমতা অর্জনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রতিবাদে আইনগত কাঠামো ও নীতি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।



