রবিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি বৈঠক পরিচালনা করেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা গড়ে তোলা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটির সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান, বীর প্রতীক মেজর (অব.) সৈয়দ মিজানুর রহমান, পিএসসি মেজর (অব.) এ কে এম হাফিজুর রহমান, মনোয়ারুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর সহ অন্যান্য সদস্য।
ড. ইউনূস বৈঠকে উল্লেখ করেন, “আমরা কেউই চিরস্থায়ী নই, তবে নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা অপরিহার্য।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের ইতিহাস, যুদ্ধের কারণ এবং ফলাফল নতুন প্রজন্মকে জানানো উচিত, যাতে তারা দেশের গৌরব ও দায়িত্বের সঙ্গে পরিচিত হয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংঘাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং বলেন, “যুদ্ধ একবারের ঘটনা নয়, সামনে আরও চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।” এই মন্তব্য দেশের নিরাপত্তা নীতি ও জাতীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনার দরজা খুলে দেয়।
ড. ইউনূসের মতে, প্রধান দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করা এবং ভুয়া দাবিদারদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অমোচনীয় শ্রদ্ধা রাখে, তাই সত্যিকারের বীরদের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।”
বৈঠকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ইতিহাস রচনা, নতুন প্রজন্মকে ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজকে পবিত্র বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “এটি আমাদের গর্বের বিষয়, তবে কয়েক বছর পর নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।”
সেইজন্য, ড. ইউনূস স্মৃতির সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং পরিকল্পনা শুরু করার আহ্বান জানান। তিনি জোর দেন, “মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাতির মধ্যে অবিনশ্বর রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম অতিরিক্তভাবে জানান, পূর্ববর্তী সরকার মুক্তিযোদ্ধা চেতনার নাম ব্যবহার করে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে এবং প্রকৃত বীরদের বঞ্চিত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, “অনেক মুক্তিযোদ্ধা এই অবিচারের কারণে কষ্টে ছিলেন।”
ফারুক ই আজমের মতে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সকল স্তরে জঞ্জালমুক্তি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চাই।”
এই বৈঠকের ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক শিক্ষা ও স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণে নতুন নীতি প্রণয়ন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠ্যক্রমে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তু সংযোজন, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি এবং বীরদের জীবনীমূলক ডকুমেন্টারি প্রযোজনা সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই উদ্যোগগুলো সরকারকে জাতীয় ঐক্য ও পরিচয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে এবং নির্বাচনী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সমর্থন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে পারে। একই সঙ্গে, বীরদের স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত দাবিগুলোও সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠকের সমাপ্তিতে উপস্থিত সকল পক্ষ একমত হন যে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। ভবিষ্যতে সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন, তহবিল বরাদ্দ এবং বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালু করার কথা বিবেচনা করছে।



