শুক্রবার বিকাল প্রায় ৩টা ৩০ মিনিটে থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূলের কাছাকাছি একটি প্যানামা পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ কাত হয়ে ডুবে যায়। জাহাজটি মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্ল্যাং বন্দর থেকে বাংলাদেশে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যাত্রা করছিল এবং এতে ১৬ জন বাংলাদেশি নাবিক সেবা দিচ্ছিল।
ক্যাপ্টেনের নির্দেশে জাহাজটি ৩০ ডিগ্রি কোণে কাত হয়ে আংশিকভাবে ডুবে যায় এবং দুইশো টির বেশি কন্টেইনার সমুদ্রে ছিটকে পড়ে। জাহাজের অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ক্যাপ্টেন জাহাজটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। থাই নৌবাহিনীর দ্রুতগতি সাড়া দিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে নাবিকদের নিরাপদে উদ্ধার করে ফুকেটের একটি হোটেলে স্থানান্তর করে। সকল নাবিকই শারীরিকভাবে সুস্থ এবং কোনো গুরুতর আঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।
এই জাহাজটি ‘এমভি সিলয়েড আরসি’ নামে পরিচিত এবং প্যানামা পতাকায় চলাচল করছিল। ৫ ফেব্রুয়ারি পোর্ট ক্ল্যাং থেকে রওনা হওয়া জাহাজটি ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল, তবে কাতের কারণ এখনও তদন্তাধীন। থাই নৌবাহিনীর সঙ্গে ফুকেট দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন কর্তৃপক্ষ, সামুদ্রিক পুলিশ, কুসলধাম ফুকেট ফাউন্ডেশন স্বেচ্ছাসেবক দল এবং সামুদ্রিক ও উপকূলীয় সম্পদ অফিস-১০ যৌথভাবে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করছে।
পরিবেশগত দিক থেকে, ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে তেল ও কন্টেইনারের ছিটকে পড়া সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই তেল অপসারণ ও কন্টেইনার পুনরুদ্ধারের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। থাই কর্তৃপক্ষের মতে, সমুদ্রের গতি ও বায়ু পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই কাজগুলো কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, এই ঘটনা এশিয়ার প্রধান বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ বহু দেশের সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। একটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “বাণিজ্যিক কন্টেইনার জাহাজের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ত্রুটিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণই এমন দুর্ঘটনার মূল কারণ হতে পারে, যা সমুদ্র পরিবেশ ও মানবজীবনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটির পর দ্রুত থাইল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ইতিমধ্যে শক্তিশালী, এবং এই ধরনের ঘটনার পর আরও সমন্বিত প্রশিক্ষণ ও তথ্য শেয়ারিং প্রয়োজন।”
থাইল্যান্ডের নৌবাহিনীর মুখপাত্রও জাহাজের কাতের প্রযুক্তিগত কারণ নির্ণয়ের জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে একই রকম দুর্ঘটনা রোধে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এই ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সমুদ্রপথে চলাচলকারী সকল জাহাজের নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য।”
অধিকন্তু, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (APAC) এর শিপিং সংস্থা ও বীমা কোম্পানিগুলোও এই ঘটনার পর ঝুঁকি মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনা করছে। তারা জাহাজের বয়স, কন্টেইনারের লোডিং পদ্ধতি এবং ন্যাভিগেশন সিস্টেমের আপডেটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
সামগ্রিকভাবে, ফুকেটের উপকূলে ডুবে যাওয়া এই কন্টেইনার জাহাজের ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক শিপিং, সমুদ্র পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এখন সমুদ্র নিরাপত্তা, জরুরি সাড়া ও পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য যৌথ উদ্যোগে কাজ করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে, থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা ১২০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশি নাবিকদের পরিবারকে তথ্য প্রদান ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য দু’দেশের কনস্যুলেট অফিসগুলোও সমন্বয় করছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনঃপর্যালোচনা ও কঠোর প্রয়োগের দাবি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।



