ঢাকার বিদ্যুৎ ভবনে রোববার অনুষ্ঠিত জ্বালানি‑বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি‑২০২৬‑২০৫০) সংক্রান্ত সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বেচ্ছায় বাতিল করা সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেন। তিনি আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে নির্বাচিত সরকারের ওপর নির্ভরশীল তা উল্লেখ করেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে আদানি গ্রুপের চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠে, তখন উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনি স্বভাবের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ইচ্ছা করলে এমন চুক্তি বাতিল করা যায় না এবং এই বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের অধীনে থাকবে।
ফাওজুল কবির খান জোর দিয়ে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ ও চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে সরকার শুরুর থেকেই স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছে। তিনি আরও জানান, সরকার একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে তার প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে, যা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি দেশের অবস্থান নির্ধারণে সহায়ক হবে।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার যদি চুক্তি বাতিলের দিকে ঝুঁকে থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা পুনরায় জোর দেন।
সরকারের দ্রুত পদক্ষেপে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা পরিবর্তন না হয়, তা নিশ্চিত করতে তার মন্ত্রণালয় একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। এই রূপরেখা অনুযায়ী, নির্বাচিত সরকার প্রয়োজনে মহাপরিকল্পনা সংশোধন করতে পারবে, তবে তা স্বচ্ছ ও প্রক্রিয়াগতভাবে সম্পন্ন হবে।
বিএনইউ লুব্রিক্যান্টের পরিচালক সালাউদ্দিন ইউসুফ বলেন, বিশ্বব্যাপী নেট‑জিরো পদ্ধতি গ্রহণের সঙ্গে বাংলাদেশের মহাপরিকল্পনা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা মূল্যায়ন করা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কার্বন নির্গমন শূন্য করার লক্ষ্যে দেশের নীতি সমন্বয় করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৪২ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে না হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংশ্লিষ্ট সেক্টরের আমদানি বন্ধ করতে পারে।
জালাল আহমেদ আরও বলেন, পোশাক রপ্তানি রক্ষা করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার অপরিহার্য। তিনি সরকারকে দ্রুত গ্রীন এনার্জি প্রকল্পে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের (জলবায়ু কনভেনশন) পরিচালক মির্জা শওকত আলী বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মহাপরিকল্পনা থেকে কয়লা ব্যবহার বাদ দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি পরিকল্পনায় কয়লা অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু দর-কষাকষিতে বাংলাদেশ বাধার মুখে পড়তে পারে।
এইসব মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারকে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা, জাতীয় নীতি এবং পরিবেশগত লক্ষ্যগুলোকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি সরকার চুক্তি বাতিলের দিকে ঝুঁকে যায়, তবে তা বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে, নির্বাচিত সরকার যদি মহাপরিকল্পনা সংশোধন করে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়ায়, তবে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে সহায়ক হবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রগতি নিশ্চিত করবে।



