চট্টগ্রাম বন্দর‑জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সংগ্রাম পরিষদ রোববার রাত ১২:৩০ টার কাছাকাছি ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানায়। সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হল, মধ্যবর্তী সরকারের সময়ে বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার চুক্তি না হওয়ার ঘোষণা। এই ঘোষণার পর শ্রমিকরা আট ঘণ্টার ধারাবাহিক কর্মবিরতি থেকে একধাপ পিছিয়ে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ধর্মঘটের স্থগিতকরণে শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন রাত্রিকালীন ঘোষণার দায়িত্ব নেন। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি না হওয়ায় সংগঠনটি স্বেচ্ছায় বিরতি নেবে এবং কর্মসূচি সোমবার সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এই সময়কালে বন্দর কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোকে অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে রক্ষা করা হবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি বহুজাতিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান, পূর্বে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পরিকল্পনা করেছিল। তবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনার পর, মধ্যবর্তী সরকারের মেয়াদে চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চুক্তি না হওয়ার বিষয়টি বন্দর শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক বিরোধের সৃষ্টি করেছিল এবং ৩১ জানুয়ারি থেকে আট ঘণ্টার কর্মবিরতির আহ্বান জানানো হয়।
ধর্মঘটের পূর্বে শ্রমিক দল একাধিক দফায় কর্মবিরতি পালন করে চুক্তি বাতিলের দাবি জানায়। এই কর্মবিরতিগুলো বন্দর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটায়; কন্টেইনার লোডিং‑আনলোডিং, গুদাম কাজ এবং শিপিং লজিস্টিকস সবই থেমে যায়। কর্মবিরতির ফলে বন্দর সম্পূর্ণভাবে অচলাবস্থায় পৌঁছায় এবং দেশের রপ্তানি‑আমদানি শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি হয়।
বিডা (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী রাত্রিকালীন সভায় জানিয়েছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি মধ্যবর্তী সরকারের সময়ে সম্পন্ন হবে না, তবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে পুনরায় আলোচনা হতে পারে। তিনি যোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান, উল্লেখ করেন, ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্তে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে এবং রোজা মাসের সময়সূচি বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ধর্মঘটের সময়কালে বন্দর কর্মীদের মধ্যে ১৬ জনকে বিভিন্ন দফায় অন্য স্থানে বদলি করা হয়েছিল, যা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে করা হয়। বদলির ফলে বন্দর পরিচালনায় কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়, তবে সম্পূর্ণ কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে এখনও সময় লাগবে।
ধর্মঘটের স্থগিতকরণ বন্দর ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক সংকেত দেয়। লজিস্টিকস কোম্পানি, রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অস্থায়ী বন্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি কমাতে পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া বন্দর পরিচালনার কৌশল ও বিনিয়োগের দিক থেকে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি না হলে চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকীকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিকল্প বিনিয়োগের সন্ধান করতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে নীতি ও নিয়মের স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ধর্মঘটের স্থগিতকরণ বন্দর শুল্ক ও টার্নওভার রেটের উপর স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া দীর্ঘমেয়াদে বন্দর টার্মিনালের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরকারকে বিকল্প কন্টেইনার টার্মিনাল মডেল ও স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়নে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, ধর্মঘটের স্থগিতকরণ বন্দর কর্মী, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং সরকারকে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি প্রদান করেছে, তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি না হওয়ার পরিণতি দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন করবে। ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফলাফল ও রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন চুক্তির পুনরায় আলোচনার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নতুন প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়েছে। সরকার, বিনিয়োগকারী এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া বন্দরকে পুনরায় গতি দিতে সময় লাগবে।



