বাংলাদেশ হাই কমিশন রোববার প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মালদ্বীপ সরকার সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচল এবং হালাল খাদ্য শিল্পে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। হাই কমিশনার মো. নজমুল ইসলাম মালদ্বীপের পরিবহন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনের সঙ্গে বৈঠক করে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গভীর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।
বৈঠকে উভয় পক্ষ সরাসরি শিপিং সংযোগের সম্ভাবনা এবং হালাল পণ্য সরবরাহের সুযোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সরাসরি শিপিং ব্যবস্থা গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমে যাবে, ফলে দু’দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে সম্মত হয়েছে।
হাই কমিশন উল্লেখ করে, সরাসরি শিপিং সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। বাংলাদেশ এই স্মারকটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে প্রস্তুত এবং মালদ্বীপের মন্ত্রীকে অগ্রগতির তথ্য জানানো হয়েছে। উভয় পক্ষের মতামত অনুযায়ী, সরাসরি শিপিং চালু হলে লজিস্টিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমেয়তা বাড়বে, যা রপ্তানিকারক, আমদানিকারক এবং শেষ গ্রাহকের জন্য উপকারি হবে।
হালাল খাদ্য শিল্পে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের হালাল সার্টিফায়েড পণ্য—যেমন প্রক্রিয়াজাত খাবার, পানীয় এবং প্যাকেটজাত পণ্য—সরবরাহে সক্ষম বলে তার সক্ষমতা তুলে ধরেছে। এই পণ্যগুলো মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন দিক খুলে দেবে।
মোহাম্মদ আমিন হাই কমিশনারের সঙ্গে হালাল পণ্য সরবরাহে বিনিয়োগ, সরবরাহ চেইন উন্নয়ন এবং মান নিয়ন্ত্রণে ঘনিষ্ঠ কাজের ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, হালাল পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে উভয় দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয় প্রয়োজন এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় অগ্রসর।
মালদ্বীপের মন্ত্রী সরাসরি শিপিং চালুর উদ্যোগে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এটি পণ্য পরিবহনের সহজতা বাড়াবে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে। তিনি কার্গো পরিবহনের জন্য মালদ্বীপের বিমানবন্দর ও সামুদ্রিক অবকাঠামো ব্যবহার করার সম্ভাবনা উল্লেখ করেন, যা লজিস্টিক খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মালদ্বীপ সরকার অতীতে বাংলাদেশের সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে তার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরাসরি শিপিং রুট গড়ে ওঠা ভারতীয় মহাসাগরে নতুন বাণিজ্যিক ধারা তৈরি করবে। বাংলাদেশ তার গার্মেন্টস, সি-ফুড এবং কৃষি পণ্যকে সরাসরি মালদ্বীপের পর্যটন বাজারে পৌঁছাতে পারবে, যা রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে মালদ্বীপের জন্য নির্ভরযোগ্য সরবরাহ উৎস নিশ্চিত হবে, ফলে আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে।
হালাল পণ্য ক্ষেত্রে, মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পে হালাল খাবারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশী প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এটি দেশের ফুড প্রোডাকশন সেক্টরের জন্য নতুন রপ্তানি বাজার খুলে দেবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে সহায়তা করবে।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করতে কিছু চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। দু’দেশের শিপিং নিয়মাবলী, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং হালাল সার্টিফিকেশন মানের সমন্বয় প্রয়োজন। এছাড়া, সরাসরি জাহাজের জন্য উপযুক্ত নৌবাহিনীর ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়নও জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে যদি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, তবে ধীরে ধীরে নির্ধারিত শিপিং সেবা চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দু’দেশের বাণিজ্যিক পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে, নতুন লগিস্টিক কোম্পানি ও যৌথ উদ্যোগের জন্ম নিতে পারে এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল আরও স্থিতিশীল হবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের সরাসরি শিপিং ও হালাল খাবার সহযোগিতার আলোচনায় এখন পর্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। উভয় পক্ষের লক্ষ্য হল লজিস্টিক খরচ কমানো, বাণিজ্যিক গতিবেগ বাড়ানো এবং দু’দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় মহাসাগরের বাণিজ্যিক মানচিত্রে নতুন দিক যোগ হবে এবং দু’দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



