রবিবার টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের সব নির্বাচনী প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন এবং নির্বাচন কমিশনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় এই লঙ্ঘনগুলো যথাযথভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে না।
টিআইবির ‘গণভোট ও প্রাক‑নির্বাচন পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অংশ রোববার একটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনের মূল উপস্থাপক হিসেবে সংস্থার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. মাহফুজুল হক উপস্থিত ছিলেন, আর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্নের উত্তর দিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণের বিশদ ব্যাখ্যা দেন।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে যে, নির্বাচন প্রচারের শুরুর দিকে কিছুটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার চিহ্ন দেখা গিয়েছিল, তবে সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সহিংসতাপূর্ণ কার্যক্রমে লিপ্ত হন। ফলে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতার জন্য অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে।
টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি স্বৈরাচারী শক্তির নির্বাচনের বিরোধী তৎপরতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি করছে। এই ঝুঁকি বিশেষত তখন বাড়ে, যখন দল ও প্রার্থীরা অর্থ, ধর্ম, পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী শক্তি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যায়। বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও জানায় যে, নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের পরেও রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে গেছেন, যা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে প্রকাশ করে। টিআইবির মতে, কমিশনের পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও সম্পদের ঘাটতি এই লঙ্ঘনগুলোকে উপেক্ষা করার মূল কারণ।
জুলাই মাসে প্রকাশিত ‘সনদ’ অনুযায়ী, দলগুলোকে মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে নারীদের প্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা খুবই সীমিত, যা টিআইবির রিপোর্টে উল্লেখযোগ্য ‘উপেক্ষা’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হিংসাত্মক আক্রমণ, গুলিবর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্মী ও প্রতিপক্ষের উপর হামলা চালিয়ে যাওয়া দেখা গেছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘নির্লিপ্ততা’কে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। টিআইবির মতে, এই পরিস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অতিরিক্তভাবে, নির্বাচন কমিশনের পরিচালনাগত ত্রুটির ফলে কমিশনের ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারী প্রায় ১৪,০০০ গণমাধ্যম কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই তথ্য লিক হওয়া মিডিয়া কর্মীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা কমিশনের তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। যদি নির্বাচন কমিশন দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে নির্বাচনী লঙ্ঘন, সহিংসতা এবং তথ্য ফাঁসের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকতে পারে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করবে।
অধিকন্তু, টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনী কোডের লঙ্ঘন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা সম্পর্কে সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ত্বরিত সমন্বয় প্রয়োজন। ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন যদি এই সমস্যাগুলো সমাধানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, আর না করলে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক অশান্তি বাড়তে থাকবে।



