রবিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার সম্প্রচারে জাতীয় নাগরিক দলের (জাতীয় নাগরিক দল) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একটি ভাষণ দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা পরিবর্তনের আহ্বান জানালেন। তিনি ১৩তম সংসদ নির্বাচনের পূর্বে দলীয় নেতাদের বক্তব্যের সুযোগের অংশ হিসেবে এই বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
সেই দিন প্রথম বক্তা ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, যিনি ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। নাহিদের ভাষণে তিনি বর্তমান শাসনব্যবস্থার বৈষম্যমূলক প্রকৃতিকে তুলে ধরে, তা দূর করে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার প্রকাশ করেন।
নাহিদ উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো মূলত বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এই বৈষম্য অর্থনৈতিক সীমা ছাড়িয়ে ক্ষমতা, মর্যাদা, আইন প্রয়োগ এবং সুযোগের বণ্টন পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়ে একটি বিশাল পরিবর্তন ঘটেছিল, যা তিনি “জুলাই বিপ্লব” হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঐ বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল পুরনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ভেঙে একটি ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা। তবে বর্তমান সময়ে পুরনো শাসনব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে একই ধরনের বৈষম্যমূলক কাঠামো পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে।
নাহিদ ১৫ বছর ধরে চালু থাকা শাসনকে “ফ্যাসিবাদী শাসন” বলে সমালোচনা করেন এবং শাসক দলের নেতৃত্বে থাকা শীর্ষ ব্যক্তিকে “খুনি হাসিনা” বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এই শাসনকালে গুম, হত্যা, বেনামি কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশেষ করে তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডি.জি.এফ.আই এবং এন.এস.আই সহ অন্যান্য সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততা এই দমনমূলক নীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
নাহিদের মতে, এই সমস্ত অপরাধের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সনাক্ত করে যথাযথ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীকে মোতায়েন করতে পারেন। তবে নাহিদ উল্লেখ করেন, উচ্চতর কমান্ডের অনাগ্রহের কারণে এই ক্ষমতা প্রায়শই ব্যবহার করা হয় না।
জাতীয় নাগরিক দলের এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য দলীয় নেতারাও নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন, যা নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক পরিবেশকে তীব্র করে তুলছে। নাহিদের আহ্বানকে সমর্থনকারী কিছু দলীয় সদস্যরা বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, শাসক দল এবং তার সমর্থকরা নাহিদের মন্তব্যকে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তারা বলছে, দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সকল দলকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, নাহিদের এই ভাষণ জাতীয় নাগরিক দলের নির্বাচনী কৌশলের একটি অংশ, যা ভোটারদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ও ন্যায়সঙ্গত শাসনের চাহিদা জাগ্রত করতে লক্ষ্যবদ্ধ। আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া র্যালি ও সভা-সমাবেশে এই থিমটি পুনরায় উত্থাপিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে, জাতীয় নাগরিক দল এবং তার জোটের অন্যান্য অংশীদাররা নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবে, যেখানে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি মূল মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।



