সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে জ্বালানি বিভাগের পাঁচটি অ্যাপ্লিকেশন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর একটি সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বর্তমান সরকারের স্বল্প মেয়াদকে বিনিয়োগের অনুপস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
উপদেষ্টা জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় প্রকল্পের জন্য বিদেশি মূলধন অপরিহার্য, তবে সরকারী মেয়াদ কম থাকায় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহে আছেন। ফলে পরিকল্পিত ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ অগ্রসর হতে পারছে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরের টেকসই উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে পূরণ হচ্ছে না। এই ঘাটতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌদি আরবে একটি সরকারি সফরের সময় উপদেষ্টা স্থানীয় রাজপরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গৃহীত পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সৌদি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সরকারের মেয়াদ কতদিন হবে তা জানতে চেয়েছিলেন, যা বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সৌদি পক্ষের প্রশ্নের পর বিনিয়োগের শর্তে সংশয় দেখা দেয় এবং ফলে পূর্বে আলোচিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল অথবা ফ্লোটিং স্টোরেজ ও রেগুলেশন ইউনিট (FSRU) প্রকল্পের অগ্রগতি থেমে যায়। উপদেষ্টা বলেন, এই প্রকল্পগুলো জিটিইউ ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার পরেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, যদি সরকারী মেয়াদ কিছুটা দীর্ঘতর হতো অথবা বিনিয়োগকারীরা আরও ধৈর্য্য ধরে থাকত, তবে এই ধরনের বড় প্রকল্পগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হতো। তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান রাজনৈতিক সময়সূচি বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করছে।
বিনিয়োগের অভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে শিল্পখাত ও রপ্তানি-নির্ভর সেক্টরে ধারাবাহিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ক্ষতি করতে পারে।
উপদেষ্টা জানান, সরকার ঋণ পরিশোধে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেছে এবং বিভিন্ন কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট প্রস্তুত করে রেখেছে, যা পরবর্তী সরকারের জন্য কাজে লাগবে। এই নথিগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগ ও বাধা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, স্বল্প মেয়াদী রাজনৈতিক চক্রের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে চায়, ফলে বড় মূলধন প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রবণতা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিতে, যদি সরকারী মেয়াদ বাড়ে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয়, তবে বিদেশি মূলধন আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং এশীয় দেশগুলোর থেকে ফ্লোটিং LNG টার্মিনাল, হাইড্রোজেন প্রকল্প এবং সোলার পার্কের মতো বড় বিনিয়োগের দরজা খুলে যাবে।
অন্যদিকে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ ঘাটতি, জ্বালানি দামের অস্থিরতা এবং শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতার হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে। তাই, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে সরকারী মেয়াদ বাড়ানো, নীতি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা জরুরি।



