ঢাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ আজ প্রাক্তন সেনা প্রধান জেনারেল (অবসর) ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রথম প্রসিকিউশন সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হন। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) পরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন। এই মামলাটি আওয়ামী লীগ শাসনকালে ঘটিত একশেরও বেশি নিখোঁজ এবং গৌণ হত্যার অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা হয়েছে।
মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ রায়ের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে শোনানো হয় এবং আজকের শোনানিতে ইকবাল করিমের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি জানিয়েছেন যে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে গার্ডিয়ান ফোর্স ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে। এই সময়ে বিভিন্ন সময়ে নাগরিক, রাজনীতিবিদ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করে ডিএফআইয়ের সেলগুলোতে আটক করা হয়।
ইকবাল করিমের বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে মন্ত্রী, পার্লামেন্টার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে আটককৃতদের ওপর কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হয় এবং প্রায়শই গোপনীয় সেলগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ার সময় কোনো আইনি নথি বা আদালতের আদেশের উপস্থিতি ছিল না বলে তিনি জোর দেন।
সাক্ষ্যের সময় তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে ডিএফআইয়ের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীকে দমন করা এবং শাসনকালের নিরাপত্তা রক্ষার নামে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা। তিনি উল্লেখ করেন যে এই সময়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।
প্রসিকিউশন দলের প্রধান গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম আজকের শোনানির আগে মামলার উদ্বোধনী বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি মামলায় প্রমাণিত হয়েছে যে অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান এবং তার অধীনস্থ কর্মকর্তারা গোপনীয়ভাবে নিখোঁজের ব্যবস্থা এবং গৌণ হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিলেন। তামিমের বক্তব্যে মামলায় উল্লিখিত তিনটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া চালু করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ ১৪ জানুয়ারি একটি আদেশ জারি করা হয়, যেখানে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই আদেশে তিনটি পৃথক অভিযোগের রূপরেখা তৈরি করা হয় এবং আজকের শোনানির জন্য সাক্ষীর বক্তব্য রেকর্ড করার তারিখ নির্ধারিত হয়।
মামলায় উল্লিখিত তিনটি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে: (১) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার নামে গোপনীয়ভাবে নিখোঁজের ব্যবস্থা, (২) অবৈধ জিজ্ঞাসাবাদ এবং শারীরিক নির্যাতন, (৩) গৌণ হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। এই অভিযোগগুলো প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে উপস্থাপন করা হবে এবং প্রতিরক্ষার পক্ষের প্রতিক্রিয়া শোনার পর চূড়ান্ত রায় দেওয়া হবে।
ট্রাইব্যুনালের শোনানির পরবর্তী ধাপ হিসেবে সাক্ষীর সাক্ষ্য রেকর্ড করা হবে এবং প্রমাণের তালিকা আদালতে জমা হবে। এরপর প্রতিরক্ষা দল তাদের যুক্তি এবং প্রমাণ উপস্থাপন করবে। বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর রায়ের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে শাস্তি নির্ধারণ করা হবে।
এই মামলাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ এই ধরনের মামলার শোনানি দেশের আইনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
মামলায় উল্লিখিত নিখোঁজ এবং গৌণ হত্যার ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও সামাজিক গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করেছে। তাই আদালত এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য এই মামলাটি সংবেদনশীল এবং জটিল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়ার সময় সকল পক্ষকে আইনি নীতি ও মানবাধিকার মানদণ্ডের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। আদালতকে নিশ্চিত করতে হবে যে সাক্ষ্যগ্রহণ, প্রমাণ উপস্থাপন এবং রায়ের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত হবে।
আজকের শোনানিতে ইকবাল করিমের সাক্ষ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মামলায় রেফারেন্স হিসেবে কাজ করতে পারে। মামলাটি এখন থেকে আরও গভীরভাবে তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের পথে অগ্রসর হবে।



