ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত রাতে ঢাকা শহরের একটি মিডিয়া অফিস থেকে ২১ জন কর্মীকে অচেনা ভাবে গ্রেফতার করার ঘটনাকে প্রেসের স্বাধীনতার ওপর ভয় সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা বলে নিন্দা করেছে। এই গ্রেফতারটি বাংলাদেশ টাইমসের কর্মীদের ওপর রাতারাতি করা হয়, কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রকাশ না করে। টিআইবি এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিডিয়া স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
টিআইবি আজ দানমন্ডির মিডাস সেন্টারে একটি অনুষ্ঠানে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছে। অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন এবং ‘রেফারেন্ডাম ও প্রি-ইলেকশন সিচুয়েশন: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক নতুন প্রতিবেদন প্রকাশের সূচনায় বক্তব্য রাখেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান গ্রেফতারকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক পূর্বধারণা’ বলে উল্লেখ করে, “রাতের অন্ধকারে কোনো প্রমাণ না দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীকে নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন কাজের কোনো ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকলেও তা বাংলাদেশের মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
গ্রেফতারকৃত ২১ জন কর্মী বাংলাদেশ টাইমসের অফিসে কাজ করছিলেন এবং তাদের কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা হয়নি। টিআইবি উল্লেখ করেছে, এই ধরনের হঠাৎ এবং অপ্রকাশিত পদক্ষেপের ফলে মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা স্বাধীন সংবাদ পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরূপ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “যদি কোনো সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি থাকে, তবে তা সমাধানের জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি রয়েছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “অধিকারের বাইরে গিয়ে, এমনভাবে মানুষকে নিয়ে যাওয়া, যদিও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবু তা একটি কঠোর বার্তা পাঠায়।”
এই ঘটনাকে টিআইবি ‘অধিকর্তা-সদৃশ’ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং মিডিয়া জগতে ব্যাপক ভয় সৃষ্টি করার অভিযোগ তুলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, “এটি শুধুমাত্র একক প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো দেশের মিডিয়া পরিবেশকে অশান্ত করে তুলেছে।”
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর অফিসে লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা মিডিয়া সংস্থার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। টিআইবি এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক গ্রেফতারকে যুক্ত করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
দুই দিন আগে সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র প্রেস কনফারেন্সে মিডিয়াকে ‘জাতির আয়না’ বলে বর্ণনা করে, “মিডিয়া ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারবে” এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান এই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তুলনা করে প্রশ্ন তোলেন, “এটি কি সত্যিই নির্ভীক রিপোর্টিংয়ের উদাহরণ?”
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “এমন কোনো পদক্ষেপ উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া করা সম্ভব কি? যদি না হয়, তবে এটি কীভাবে ঘটতে পারে তা স্পষ্ট করা দরকার।” এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি গ্রেফতার ও অফিসে আক্রমণের পেছনের দায়িত্বের স্বচ্ছতা দাবি করেছেন।
টিআইবি ভবিষ্যতে মিডিয়া স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ভাবে চলবে না।”
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা টিআইবির অবস্থানকে মিডিয়া স্বাধীনতার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল হিসেবে দেখছেন। তবে সরকারী পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।
টিআইবির এই প্রতিবাদ ও প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দ্রুত ব্যাখ্যা ও পদক্ষেপের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যাতে মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়।



