রংপুরের ৪ নং আসনে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রগতি বর্মন তমা, ৩৩ বছর বয়সী, নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রধানত কৃষক, নারীর মর্যাদা ও মৌলিক জনসেবা নিশ্চিত করার দিকে কেন্দ্রীভূত। তিনি পিরগাছা ও কাউনিয়ার দুইটি বড় আলু উৎপাদনকারী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে কৃষি ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি জোর দেন।
প্রগতি বর্মন তমা বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের তরুণ মুখ হিসেবে পরিচিত। তিনি পূর্বে কোনো সরকারি পদে ছিলেন না, তবে স্থানীয় সংগঠনে সক্রিয় ছিলেন এবং কৃষক সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার মূলত গ্রামীণ সমস্যার সমাধানে নিবেদিত, বিশেষ করে আলু ও ধানের চাষে জড়িত কৃষকদের জন্য ন্যায়সঙ্গত মূল্য নিশ্চিত করা।
রংপুর-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত পিরগাছা ও কাউনিয়া জেলাগুলি আলু চাষের জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলগুলোতে আলু উৎপাদন দেশের মোট উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গঠন করে। তমা উল্লেখ করেন, যদি এই অঞ্চলের কৃষি অবহেলিত হয়, তবে স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তিনি ম্যানিফেস্টোতে কৃষি সংক্রান্ত বেশ কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
কৃষকদের জন্য তিনি আলু চাষে সাবসিডি, ধান ও আলুসহ সব ফসলের ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা, সরকারী শীতলাগার স্থাপন এবং প্রতি থলে ১০০ টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। এছাড়া সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম কমিয়ে কৃষকের আর্থিক বোঝা হ্রাস এবং সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রদান করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব ব্যবস্থা কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধি করতে লক্ষ্য রাখে।
কৃষি ছাড়াও তমা স্বাস্থ্য, নারী নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত নীতি তুলে ধরেছেন। তিনি সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড জারি, সরকারী হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে সেবা, স্থানীয় কেন্দ্র থেকে সরাসরি ধান ক্রয় ব্যবস্থা, নারীর সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য বিশেষ পদক্ষেপের দাবি করেন। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালু করা, নতুন চাকরি সৃষ্টির উদ্যোগ এবং বেকারত্ব কমাতে ভাতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মার্জিনালাইজড সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার কথাও ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করা হয়েছে। দরিদ্র ও ভূমিহীন জনগণের জন্য খাস জমি পুনরুদ্ধার, ভূমিহীনদের পুনর্বাসন, দালিত ও হারিজানদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা, কৃষি ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি তমা দিয়েছেন।
প্রগতি বর্মন তমা বলেন, “আমার আসনটি সম্পূর্ণভাবে কৃষি ভিত্তিক। যদি কৃষকরা টিকে না থাকে, তবে এই অঞ্চলের উন্নয়ন অসম্ভব। তাই আমার ম্যানিফেস্টোর শীর্ষে কৃষি বিষয়টি রাখা হয়েছে।” তার এই বক্তব্যে তিনি কৃষকের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে উন্নয়নের পথ দেখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
বড় পার্টির প্রচলিত শোরগোলপূর্ণ প্রচার—বড় লাউডস্পিকার, দীর্ঘ মোটরকেড—এর বিপরীতে তমা স্বল্প বাজেটের মধ্যে নিজে নিজে গাঁথা-গাঁথি করে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন। তিনি প্রতিদিন সকালে হাতে কাঁচি চিহ্নযুক্ত পত্রিকাগুলি নিয়ে পায়ে হেঁটে গাঁগুলোতে, মাঠে, আঙিনায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিটি গাঁয়ে পৌঁছে তিনি পত্রিকায় উল্লেখিত প্রতিশ্রুতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেন এবং ভোটারদের প্রশ্নের উত্তর দেন। কখনো কখনো খাবার বাদ দিয়ে কাজ চালিয়ে যান, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসেন, তবে তার বাড়ির আশেপাশে কোনো ভিড় দেখা যায় না। তমা জানান, তহবিলের অভাবে তিনি কোনো কর্মী নিয়োগ করতে পারেননি, তাই সব কাজ নিজেই করছেন।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তমা বিশ্বাস করেন, সরল ও সরাসরি পদ্ধতি ভোটারদের হৃদয়ে পৌঁছাবে। তিনি উল্লেখ করেন, “টাকা না থাকলেও, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বললে তাদের সমস্যার প্রকৃত চিত্র দেখা যায় এবং সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।” তার এই পদ্ধতি অন্যান্য প্রার্থীদের উচ্চশব্দের প্রচার থেকে আলাদা, যা ভোটারদের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক যোগাযোগের উদাহরণ হতে পারে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, তমার কৃষক-কেন্দ্রিক ম্যানিফেস্টো যদি যথাযথভাবে প্রচারিত হয়, তবে আলু ও ধান চাষী ভোটারদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেতে পারে। তবে তার সীমিত আর্থিক সম্পদ ও প্রচার মাধ্যমের অভাব তাকে বড় পার্টির প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। পরবর্তী সপ্তাহে আসন্ন সমাবেশ ও স্থানীয় সভায় তমা কীভাবে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, তা রাজনৈতিক দৃশ্যপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠবে।
এই নির্বাচনী চক্রে প্রগতি বর্মন তমার স্বতন্ত্র প্রচার কৌশল ও কৃষক-প্রথম নীতি রংপুর-৪ আসনের ভোটারদের মধ্যে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে। তার ম্যানিফেস্টোর বাস্তবায়ন ও ভোটের ফলাফল রংপুরের কৃষি-নির্ভর অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গঠনে প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।



