ঢাকা, ধানমন্ডি – ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান রোববার টিআইবির অফিসে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, জুলাই মাসে নির্ধারিত গণভোটের বৈধতা ও কার্যকারিতা ইসি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সমন্বয়হীনতার কারণে হুমকির মুখে। তিনি বলেন, সমন্বয়ের অভাব, আইনি অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক চাপ রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহৎ স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্মেলনে টিআইবির “গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর ড. ইফতেখারুজ্জামান এই মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঐতিহাসিক গুরুত্বের গণভোট আয়োজনের জন্য অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, অস্পষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইলেকশন কমিশনের সংবিধানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করার দিকে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং বহু ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখতে পারছে না। এই দুর্বলতা গণভোটের ফলাফলকে অবৈধ করে তুলতে পারে।
কোড অফ কন্ডাক্টের লঙ্ঘন—অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই—বিস্তৃতভাবে ঘটলেও ইসি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না, এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ইসির সক্ষমতা সীমিত।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অংশও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান। তিনি যুক্তি দেন, এই নিষ্ক্রিয়তা গণভোটের ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে।
ডিজিটাল মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্যের বিস্তার ও হেট স্পিচের প্রাদুর্ভাব ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, গুগল ও মেটা (ফেসবুক) মত বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কন্টেন্ট সরাতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এ ধরনের অনিয়মে ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাবও রয়েছে, তিনি বলেন। তিনি যুক্তি দেন, এই কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর নির্ভরতা তাদের কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ করে।
সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধী অবস্থান সরকারের নীতিকে দোলায়মান করে তুলেছে।
দুই পক্ষকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রশ্নকে আরও অস্পষ্ট করেছে, তিনি বলেন। এই অধ্যাদেশের ফলে ভোটের বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহের স্রোত বেড়েছে।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে তিনি অপ্রয়োজনীয় বলে সমালোচনা করেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান যুক্তি দেন, দুটি প্রক্রিয়া একসাথে চালালে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা বৃদ্ধি পাবে, যা ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান শেষ করে বলেন, ইসি ও সরকার যদি সমন্বয়হীনতা দূর করে, আইনি স্পষ্টতা এনে এবং রাজনৈতিক চাপ থেকে স্বাধীনতা বজায় রাখে, তবে জুলাই গণভোটের ম্যান্ডেট রক্ষা করা সম্ভব হবে। তিনি টিআইবির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনকে এই দিকগুলো সমাধানের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যতে, ইসি ও সরকারকে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং আইনি স্পষ্টতার ওপর জোর দিতে হবে, যাতে গণভোটের ফলাফলকে বৈধতা ও জনবিশ্বাস অর্জন করা যায়। এই প্রক্রিয়া না হলে, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।



