অন্তর্বর্তী সরকার রবিবার সকালে ‘রিফর্ম বুক’ শিরোনামে একটি প্রকাশনা প্রকাশ করে, যেখানে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বিভিন্ন খাতে নেওয়া সংস্কারগুলোর সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হয়েছে। এই প্রকাশনা সরকারী প্রেস উইংের এক বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে জানানো হয়, যা দেশের রাজনৈতিক‑অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এ ‘আর নয়’ স্লোগানে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী ও সাধারণ নাগরিকের সমাবেশে বাংলাদেশ সরকারী দমন নীতি থেকে বেরিয়ে আসার সংকেত দেয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে, যার পর গভীর সংকটের মুখে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
গঠনকালে বাংলাদেশ সরকারকে চরম অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ধরা পড়ে। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অপশাসনের ফলে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ভেঙে পড়ে, সরকারি সংস্থাগুলো থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার পাচার হয় এবং ব্যাংকিং খাত বিশাল ঋণে নিমজ্জিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থের অধীন হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক দমন‑পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে স্বাধীনতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ভোটারবিহীন নির্বাচন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস এবং নাগরিক সমাজের কার্যক্রমের স্থবিরতা এই সময়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করে। দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বহু সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, যা আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সুপারিশ প্রদান করে।
কমিশনগুলোর সুপারিশ ও সরকারের নিজস্ব উদ্যোগের ভিত্তিতে ১৮ মাসের মধ্যে প্রায় ১৩০টি নতুন বা সংশোধিত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ৬০টিরও বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ সংস্কার ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, যা কেবল ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তনের সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। জাপান সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৭,৪০০ পণ্যের উপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা রপ্তানি বাজারের প্রসার ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়তা করবে।
চীনের সঙ্গে চলমান সহযোগিতার কথাও রিফর্ম বুক‑এ উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তবে জাপান সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি দেশের বাণিজ্যিক কাঠামোকে বহুমুখী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রেস উইংের তথ্য অনুযায়ী, সংস্কার প্রক্রিয়ার দ্রুত অগ্রগতি এবং বাস্তবায়নের হার সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে পুনরায় স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই প্রকাশনা ভবিষ্যতে আরও সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং দেশের রাজনৈতিক‑অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বইটি প্রকাশের মাধ্যমে সরকার তার স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়াতে চায়, যাতে নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই উদ্যোগের পরবর্তী ধাপ হিসেবে আরও আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হবে বলে সরকারী সূত্রে জানানো হয়েছে।



