ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাঙামাটির ২১৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২০টি দুর্গম স্থানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নির্বাচনী সামগ্রী ও কর্মী পাঠানো হয়েছে। গত শনিবার সকাল ৯টা থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে চারটি দূরবর্তী কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বালট বাক্স, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনী কর্মী পৌঁছানো শুরু হয়। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল কঠিন ভূগোলিক অবস্থায় ভোটগ্রহণের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সময়মতো প্রস্তুতি সম্পন্ন করা।
হেলিকপ্টার চালু করা চারটি কেন্দ্র হল বরকল উপজেলায় দুটো, জুরাছড়ি উপজেলায় একটি এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় একটি। এসব কেন্দ্রের পথে সড়ক অবস্থা দুর্বল, ফলে ভূমি গাড়ি দিয়ে সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব। তাই বিমান পরিবহনই একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে সরাসরি ভোটবক্স, গোপনীয়তা রক্ষার জন্য দরজা, এবং ভোট গ্রহণের জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী অবতরণ করে।
রাঙামাটির রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলাপ্রশাসক নাজমা আশরাফী জানান, আজকের হেলিকপ্টার চালু করা চারটি কেন্দ্রের পাশাপাশি বাকি ১৬টি দুর্গম কেন্দ্রেও একই ব্যবস্থা আগামী চার দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে সব কেন্দ্রের প্রস্তুতি শেষ করা হবে। এই সময়সূচি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে চলা হয়েছে এবং সকল কেন্দ্রের সময়মতো প্রস্তুতি নিশ্চিত করবে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী রাঙামাটির ১০টি উপজেলায় দুইটি পৌরসভা এবং মোট ৫০টি ইউনিয়ন মিলিয়ে ৫,৯২৬৭ জন ভোটার নিবন্ধিত। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,৬৩৪১০ এবং নারী ভোটার ২,৪৫৮৫৫, পাশাপাশি হিজরা ভোটার দুজন রয়েছে। ভোটারসংখ্যার এই বিশদ বিবরণ নির্বাচন কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ক্ষমতা এবং সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।
দুর্গম ভোটকেন্দ্রের মোট সংখ্যা ২০টি, যেগুলোকে হেলিসর্টি কেন্দ্র বলা হয়। এই কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৩০,০০০ এর বেশি ভোটার নিবন্ধিত, যা সমগ্র জেলার ভোটারসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সরবরাহের ফলে এই ভোটারগণ সময়মতো ভোট গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং ভোটের গোপনীয়তা বজায় থাকবে।
বিভিন্ন উপজেলায় হেলিসর্টি কেন্দ্রের বণ্টন নিম্নরূপ: বাঘাইছড়ি উপজেলায় ছয়টি, বরকলে দুটি, জুরাছড়িতে সাতটি এবং বিলাইছড়িতে পাঁচটি কেন্দ্র রয়েছে। এই বণ্টন দেখায় যে নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জযুক্ত এলাকাগুলো মূলত জুরাছড়ি ও বাঘাইছড়ি। এসব স্থানে হেলিকপ্টার চালু করা ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, হেলিকপ্টার ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসন দুর্যোগপ্রবণ ও দূরবর্তী এলাকায় ভোটের প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। এটি ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং ভোটার টার্নআউট বাড়াতে সহায়তা করবে। এছাড়া, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোরও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে, যাতে নির্বাচনকে ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ বলা যায়।
আসন্ন ভোটের আগে বাকি হেলিসর্টি কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও স্বতন্ত্র সংস্থাগুলোকে পর্যবেক্ষণ মিশন চালু করতে বলা হয়েছে। এভাবে ভোটের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে এই মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে এবং সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সহযোগিতা করতে আহ্বান জানিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, রাঙামাটির নির্বাচনী প্রস্তুতিতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু সরবরাহের সময় কমায় না, বরং কঠিন ভূখণ্ডে ভোটগ্রহণের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করে। আগামী কয়েক দিনে বাকি ১৬টি দুর্গম কেন্দ্রেও একই ব্যবস্থা সম্পন্ন হবে, ফলে পুরো জেলা ভোটের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় থাকবে। এই প্রস্তুতি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মসৃণ চলাচল নিশ্চিত করার একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।



