বিএনপি ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে, যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশীয় উৎপাদনকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য জিডিপি দ্বিগুণ করতে হবে এবং কর-জিডিপি অনুপাতকে ১৫ শতাংশে বাড়াতে হবে।
ম্যান্ডেটের মূল বার্তা হল, পরবর্তী দশকে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া, নইলে অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। ম্যানিফেস্টোর কেন্দ্রীয় বিষয় হল, দেশের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ে তোলা।
বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি দ্বিগুণ করতে গড়ে বার্ষিক প্রায় দশ শতাংশ বৃদ্ধি দরকার, যা দেশের ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই স্তরের বৃদ্ধি অর্জনের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের অংশকে বর্তমান প্রায় ২৩ শতাংশ থেকে কমপক্ষে ৩৫ শতাংশে বাড়াতে হবে।
বেসামরিক খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবকাঠামো, উৎপাদন শিল্প এবং সেবা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। তবে বিনিয়োগের মাত্রা বাড়লেও, কাঠামোগত রূপান্তর সম্পন্ন করতে সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যও ম্যানিফেস্টোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা বিশ্বে সর্বনিম্নের মধ্যে একটি। ১৫ শতাংশে পৌঁছাতে হলে কর নীতি, সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সক্ষমতায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
এ পর্যন্ত সরকারগুলো এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে প্রশ্ন উঠছে, নতুন শাসন কীভাবে পূর্বের ব্যর্থতা অতিক্রম করবে। ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করা হয়েছে, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়ানো, ডিজিটাল ট্যাক্স সিস্টেমের প্রসার এবং করদাতার দায়িত্ববোধ জোরদার করার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা যাবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা সংস্থা বস্টন কনসালটিং গ্রুপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে একই অর্থনৈতিক স্তরে পৌঁছাতে পারে, যদি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতা, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং ভোক্তা আস্থার উন্নতি অব্যাহত থাকে।
বিএনপির পরিকল্পনা এই আন্তর্জাতিক অনুমানের তুলনায় সময়সীমা কমিয়ে দেয়, ফলে দ্রুত উন্নয়নের জন্য উচ্চতর গতি বজায় রাখতে হবে। তবে উচ্চ গতি বজায় রাখতে হলে বিনিয়োগের গুণগত মান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সমন্বয় প্রয়োজন।
ম্যনিফেস্টোর আরেকটি মূল দিক হল, নভেম্বর মাসে বাংলাদেশকে কম উন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে মুক্তি পেতে হবে। এই পরিবর্তনের ফলে দেশটি দুল্লভ দায়িত্বমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার এবং কম সুদের ঋণ সুবিধা হারাবে, যা পূর্বে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ছিল।
এজন্য সরকারকে এলডিসি সুবিধা হারানোর পরেও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে সক্ষম এমন শিল্প ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। ম্যানিফেস্টোতে রপ্তানি খাতের গুণগত মান উন্নয়ন, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্য বৈচিত্র্যকরণের পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে, রপ্তানি শিল্পের উন্নয়নের জন্য নতুন মানদণ্ড প্রয়োগ, উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা লক্ষ্য।
বিএনপির ম্যানিফেস্টোতে আর্থিক নীতি, বাণিজ্য নীতি এবং শিল্প নীতির সমন্বয়কে ‘দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন কৌশল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই কৌশলটি দেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে, কর সংগ্রহ বাড়িয়ে এবং রপ্তানি গুণগত মান উন্নত করে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায়।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, বর্তমান সরকার এই লক্ষ্যগুলোকে অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী বলে সমালোচনা করেছে। তারা যুক্তি দেয়, দশকের মধ্যে জিডিপি দ্বিগুণ করা এবং কর-জিডিপি অনুপাত দ্বিগুণ করা বাস্তবিকভাবে কঠিন, বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি সরকার কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে পারে, তবে উচ্চ লক্ষ্যগুলো অপ্রাপ্য নয়। তবে এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতি ধারাবাহিকতা অপরিহার্য।
ম্যনিফেস্টোর প্রকাশের পর থেকে রাজনৈতিক আলোচনায় এই লক্ষ্যগুলোকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ভোটাররা এখন এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এবং প্রভাব সম্পর্কে মূল্যায়ন করছেন।
আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে, এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কিনা এবং দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা কী হবে। যদি বিএনপি শাসনে আসেন, তবে তারা ম্যানিফেস্টোর প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য নীতি গঠন ও বাস্তবায়ন শুরু করবে।
অন্যদিকে, বর্তমান শাসন দলও নিজেদের নীতি সমন্বয় করে একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে ভোটারদের আস্থা বজায় থাকে। শেষ পর্যন্ত, দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, নীতি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশের সমন্বয়ের উপর।



