রংপুরের ঘনিরামপুর গ্রামে নারী শ্রমিকদের তৈরি জুতা ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনৈতিক কাঠামোতে নতুন দিক উন্মোচন করেছে। এই উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি হল ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস, যা ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে রপ্তানি বাজারে সক্রিয়।
ঘনিরামপুর গ্রাম পূর্বে দারিদ্র্য ও ঘরোয়া সীমাবদ্ধতার সঙ্গে পরিচিত ছিল। পুরুষরা কর্মসংস্থান খোঁজে শহরে বা বিদেশে পাড়ি দিতেন, আর নারীরা প্রায়শই গৃহকর্মে সীমাবদ্ধ থাকতেন। এই সামাজিক কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে সম্প্রতি গৃহস্থালির আয় বাড়াতে নারীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্লিং লেদার প্রোডাক্টসের প্রতিষ্ঠাতা দুই ভাই মো. হাসানুজ্জামান ও মো. সেলিম, যাঁরা ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহস্থালির ব্যবসা চালিয়ে সফলতা অর্জন করেন। বিদেশে অর্জিত মূলধন ও ব্যবস্থাপনা জ্ঞান দেশে ফিরিয়ে আনার পর, প্রথমে নীলফামারীর বাবুপাড়ায় ২০০৯ সালে একটি হিমাগার স্থাপন করেন, এরপর ২০১২ সালে রংপুরের মিঠাপুকুরে আরেকটি হিমাগার চালু করেন। এই অভিজ্ঞতা তাদের শিল্পখাতে বিনিয়োগের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
২০১৭ সালে দুই ভাই ঘনিরামপুরে রপ্তানিমুখী জুতার কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। টারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে, মহাসড়কের পাশে, ৯.৫ একর জমিতে এই কারখানা নির্মিত হয়। মোট বিনিয়োগ প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
কারখানার কর্মশক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার কর্মীকে কর্মসংস্থান প্রদান করে। অধিকাংশ কর্মীই স্থানীয় নারীরা, যাঁরা পূর্বে গৃহকর্মে সীমাবদ্ধ ছিলেন। উৎপাদিত জুতাগুলি ইউরোপ ও আমেরিকান বাজারে রপ্তানি হয়, যা গ্রামবাসীর আয় বাড়িয়ে তুলেছে এবং আঞ্চলিক বেকারত্বের হার কমিয়েছে।
2023 সালে বড় ভাই মো. সেলিমের বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে মৃত্যু ঘটে। তার পর থেকে মো. হাসানুজ্জামান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শনের সময় তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও বড় ভাইয়ের দেশসেবা ইচ্ছা এই উদ্যোগের মূল ভিত্তি।
কারখানার তিনটি উৎপাদন ইউনিটে আধুনিক মেশিন ও সেলাইযন্ত্র চালু রয়েছে। মেশিনের শব্দ ও কর্মীদের দ্রুত কাজের গতি পুরো এলাকাকে গুঞ্জনময় করে তুলেছে। প্রতিটি উৎপাদন লাইনে সুপারভাইজাররা ঘুরে ঘুরে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করেন, যা রপ্তানি মানদণ্ড পূরণে সহায়তা করে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরোপ ও আমেরিকান গ্রাহকদের উচ্চমানের চামড়া জুতার চাহিদা স্থিতিশীল। ব্লিং লেদার প্রোডাক্টসের রপ্তানি মডেল এই চাহিদা পূরণে সক্ষম, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি পরিবর্তন, শুল্ক ও লজিস্টিক খরচের ওঠানামা ব্যবসার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল মার্কেটিং ও সরবরাহ শৃঙ্খল অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে বাজার শেয়ার বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ মানদণ্ডে মানিয়ে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে। তবে শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়ন ও মুদ্রা পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, ঘনিরামপুরের নারীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই জুতা কারখানা স্থানীয় কর্মসংস্থান, আয় ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রপ্তানি বাজারে সাফল্য বজায় রাখতে উৎপাদন দক্ষতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের প্রতি সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।



