সিলেটের ম্যাগোস্মানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালতে ৯ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে এক কারাবন্দীর মৃত্যু ঘটেছে। রিয়াজুল ইসলাম রিজুল, যিনি সুনামগঞ্জের পূর্ববিরগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগে সভাপতি ছিলেন, ৩০ মার্চ ২০২২-এ ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামক যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। গ্রেফতারকৃত রিয়াজুলের মৃত্যু ঘটার সময় তিনি কারাগারিক তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
রিয়াজুলের পূর্বে কিছু স্বাস্থ্যের সমস্যা ছিল বলে জানা যায়, তবে তার মৃতদেহের পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রিয়াজুলের ভাইপো আবু বকর সিদ্দিকের মতে, কোনো ঘটনার ফলে এমন আঘাত হওয়া সম্ভব নয় এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে তাকে শারীরিকভাবে হিংসা করা হয়েছে। পরিবার ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করেছে এবং পরিস্থিতি অনুকূল হলে আইনি পদক্ষেপ নেবে।
সুনামগঞ্জ কারাগার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মো. মাইন উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, রিয়াজুলের মামলাটি তিনি তৎক্ষণাৎ স্মরণ করতে পারছেন না এবং নথিপত্র যাচাই করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতি মাসে নতুন বন্দি আসার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সব ঘটনার বিস্তারিত মনে রাখা কঠিন। এই মন্তব্যের পরেও রিয়াজুলের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্তের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
রিয়াজুলের মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলি কারাগারে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও বন্দি-দুর্ভোগ এবং চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার অভিযোগগুলো অব্যাহত রয়েছে। এই ধরনের ঘটনা দেশের মানবাধিকার রেকর্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কারাগার দিকনির্দেশনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মোট ২৭০ জন বন্দি মৃত্যুবরণ করেছে। এর মধ্যে ১৫৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সময় মারা গেছেন, ১১১ জন হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারা গেছেন এবং বাকি চারজন আত্মহত্যা করেছেন। এই সংখ্যা দেশের কারাগার ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে।
দৈনিক স্টার দ্বারা বিশ্লেষিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, মৃতদের মধ্যে ২১ জন আওয়ামী লীগের নেতা বা কর্মী ছিলেন, যদিও বর্তমানে ওই দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। এই তথ্য রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কারাগার মৃত্যুর বিশ্লেষণে নতুন দিক যোগ করেছে।
বন্দি-দেহের মৃত্যুর কারণের বিশদে দেখা যায়, অন্তত ১৬ জন নেশা মামলায়, দুইজন যুদ্ধাপরাধ মামলায় এবং চারজন হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার ছিলেন। বাকি মৃতদের সম্পর্কে মিডিয়ায় স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি এবং কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে বন্দিদের পরিচয় সংক্রান্ত পৃথক ডাটাবেসের অভাব রয়েছে।
২০২৪ সালে মোট ২৬১ জন বন্দি মৃত্যুবরণ করেছে। এদের মধ্যে ১৪০ জন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের সময় মারা গেছেন, ১২০ জন হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারা গেছেন এবং একজন আত্মহত্যা করেছেন। এই পরিসংখ্যান পূর্ব বছরের তুলনায় সামান্য কম হলেও এখনও উদ্বেগের বিষয় রয়ে গেছে।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেছেন, কারাগারে মৃত্যুর কারণগুলো যথাযথভাবে তদন্ত না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন। রিয়াজুলের পরিবার যে আইনি পদক্ষেপ নিতে চায়, তা যদি সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় তবে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অধিকন্তু, কারাগার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালার পুনর্বিবেচনা এবং বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ তদারকি প্রয়োজন। সরকার যদি এই সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছ থেকে চাপ বাড়তে পারে।
সর্বশেষে, রিয়াজুলের মৃত্যুর তদন্তের ফলাফল এবং ২০২৪ সালের কারাগার মৃত্যুর পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ দেশের আইনি ও মানবাধিকার পরিবেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।



