রোববার প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার গৃহীত আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারগুলোকে সংকলিত করে একটি বই প্রকাশ করেছে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকারী কর্মকর্তারা সংস্কার কমিশনের গঠন ও তার সুপারিশের ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেছেন।
দপ্তরের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং তার সুপারিশ অনুসারে আইন ও নীতি পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়। এই সময়কালে, ১৮ মাসের মধ্যে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করা হয়েছে এবং ৬০০‑এর বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই সংস্কারগুলোর প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রেকর্ড করা হয়েছে। জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৭,৪০০টি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ফলস্বরূপ, পারস্পরিক শুল্ক হার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া, চীনা ঋণের মেয়াদ পুনঃনির্ধারণ, স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে অগ্রগতি ঘটেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অংশ হিসেবে, পূর্ববর্তী শাসনামলে দায়িত্ব পালনকারী শত শত রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে, এবং ৪২টি মন্ত্রণালয়ের ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়েছে, যা তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে ১,২০০ের বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকার ভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে পুনর্গঠন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ নামে নতুন ইউনিট গঠন করা হয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে।
বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, সব আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক আওতায় আনা হয়েছে এবং বিচারপতি নিয়োগে মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো বিচারিক স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পূর্বে নিষিদ্ধ করা কিছু গণমাধ্যম পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকার দাবি করে, এই উদ্যোগগুলো স্বাধীন মিডিয়ার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, কিছু রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের চাপে কিছু নীতি ও প্রক্রিয়ার যথাযথ পর্যালোচনা বাদ পড়তে পারে। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করে, এই সংস্কারগুলো আগামী নির্বাচনে সরকারকে প্রো-ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও উন্নয়নমূলক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করবে। তবে, বিরোধী দলগুলো এই পদক্ষেপগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
বই প্রকাশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার তার সংস্কার কর্মসূচি জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে চায় এবং এ থেকে প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়া নীতি নির্ধারণে ব্যবহার করবে বলে জানানো হয়েছে। সরকারী সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তী ধাপে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে অবশিষ্ট ১৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিগুলোকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
এই সংস্কার উদ্যোগের সমগ্র পরিসর ও অগ্রগতি দেশের উন্নয়ন সূচকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে বাস্তবায়নের গতি ও গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য অব্যাহত তদারকি ও জনমত পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।



